বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম ব্যস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দিতে যুক্তরাষ্ট্রকে দুটি প্রধান শর্ত দিয়েছে ইরান। তেহরান জানিয়েছে, ওয়াশিংটন তাদের ওপর থেকে সামরিক চাপ কমালে এবং দেশটির বন্দরগুলোর ওপর আরোপিত নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার করে নিলে মাত্র সাত দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালি পুনরায় সচল করে দেওয়া হবে।

জাপানের বার্তা সংস্থা ‘কিয়োদো নিউজ’ ও আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা ‘রয়টার্স’-কে পৃথকভাবে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এক জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা এই শর্ত ও কূটনৈতিক বার্তার কথা নিশ্চিত করেছেন।

কূটনৈতিক তৎপরতা ও মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে বার্তা কিয়োদো নিউজের প্রতিবেদনে প্রথম খবরটি উঠে আসে। সেখানে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে থমকে যাওয়া আলোচনা পুনরায় শুরু করতে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করেছে তেহরান। ইরানি ওই কর্মকর্তা জানান, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ইরানের নতুন প্রস্তাবটি ইতিমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।

প্রস্তাব অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র যদি সামরিক চাপ হ্রাসের প্রাথমিক পদক্ষেপ নেয়, তবে ইরান এক সপ্তাহের মধ্যে এই কৌশলগত নৌপথ দিয়ে পুনরায় জাহাজ চলাচলের সুযোগ দিতে প্রস্তুত। একই সাথে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের বৈরিতা ও শত্রুতার স্থায়ী অবসানের লক্ষ্যে নতুন করে পূর্ণাঙ্গ আলোচনা শুরু করার ইচ্ছাও প্রকাশ করেছে ইরান। তবে কিয়োদো ও রয়টার্সকে তথ্য দেওয়া দুই কর্মকর্তা একই ব্যক্তি কি না, তা স্বতন্ত্রভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

জাতিসংঘ অধিবেশনকে ‘সুবর্ণ সুযোগ’ মনে করছে তেহরান রয়টার্সের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে অংশ নিতে যাওয়া উচ্চপর্যায়ের ইরানি প্রতিনিধিদলকে ওয়াশিংটনের সাথে কূটনৈতিক আলোচনা পুনরুজ্জীবিত করার পূর্ণ এখতিয়ার ও ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।

উক্ত ইরানি কর্মকর্তা বলেন, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য পুনরায় কূটনীতির টেবিলে ফিরে আসার একটি ‘সুবর্ণ সুযোগ’। তেহরান আলোচনায় ফিরতে পুরোপুরি প্রস্তুত থাকলেও ওয়াশিংটনকে তাদের ইতিবাচক আগ্রহের ‘বাস্তব ও দৃশ্যমান প্রমাণ’ দেখাতে হবে। মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে পাঠানো প্রস্তাবের মূল লক্ষ্য হলো স্থায়ী সমাধানের পথ খুঁজে বের করা।

বিশ্ব বাজারে হরমুজের গুরুত্ব ও তেলের দামের প্রভাব হরমুজ প্রণালি বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের প্রধানতম ধমনি হিসেবে বিবেচিত। বর্তমান সংঘাতের আগে এই প্রণালি দিয়ে দৈনিক গড়ে প্রায় ১২৫টি বড় বাণিজ্যিক জাহাজ—যার মধ্যে জ্বালানি তেলবাহী ট্যাংকার ও এলএনজি গ্যাসবাহী জাহাজ অন্তর্ভুক্ত—চলাচল করত। কিন্তু সাম্প্রতিক সামরিক সংকটের কারণে সোমবার সেই সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে মাত্র দু’টিতে নেমে আসে বলে রয়টার্সের প্রাথমিক তথ্যে উঠে এসেছে।

বিশ্বের মোট ব্যবহৃত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় ২০ শতাংশ এই সংকীর্ণ প্রণালি দিয়েই পরিবাহিত হয়। ফলে দীর্ঘদিন এটি বন্ধ থাকায় বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে তীব্র সংকট ও চাপ তৈরি হয়েছিল। ইরানের প্রস্তাবটি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশের পর পরই বিশ্ববাজারে তেলের দাম কিছুটা হ্রাস পেয়েছে। রয়টার্স জানায়, খবরটি ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম প্রায় ১ শতাংশ কমে যায়।

ওয়াশিংটনের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় বিশ্ব ইরানের দেওয়া এই প্রস্তাবের মূল দাবি—যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের সামরিক চাপ কমাতে হবে এবং ইরানি বন্দরগুলোর ওপর থেকে অবরোধ প্রত্যাহার করতে হবে। এর ইতিবাচক সাড়া পেলেই হরমুজ প্রণালি চালুর প্রক্রিয়া দ্রুত শুরু করবে তেহরান।

এর আগে চলতি বছরের জুনেও হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া নিয়ে দুই দেশের মধ্যে একটি সমঝোতার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সে সময় যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধ প্রত্যাহারের বিনিময়ে ইরানের প্রণালিটি খুলে দেওয়ার কথা ছিল। তবে পরবর্তীকালে একের পর এক সামরিক পদক্ষেপ ও উত্তেজনার কারণে সেই কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ভেস্তে যায়।

জাতিসংঘ অধিবেশনকে কেন্দ্র করে তেহরানের নতুন এই কূটনৈতিক চাল দুই পরাশক্তির মধ্যে বরফ গলানোর নতুন একটি পথ তৈরি করেছে। তবে এখন বিশ্ব সম্প্রদায়ের নজর ওয়াশিংটনের দিকে—হোয়াইট হাউজ এই প্রস্তাবকে কীভাবে গ্রহণ করে এবং পরবর্তীতে কী পদক্ষেপ নেয়।