রক্তচাপ বা ব্লাড প্রেসারকে আমরা সাধারণত দুটি সংখ্যার হিসাব হিসেবে দেখি। কিন্তু দীর্ঘদিন রক্তচাপ বেশি থাকলে এর প্রভাব পড়ে সরাসরি হৃদ্‌যন্ত্র ও শরীরের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের ওপর।

উচ্চ রক্তচাপ দীর্ঘদিন নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকলে শরীরে রক্ত সঞ্চালন বজায় রাখতে হৃদ্‌যন্ত্রকে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি পরিশ্রম করতে হয়। এতে রক্তনালি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি হৃদ্‌রোগ, হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক ও কিডনি বিকল হওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে।

তবে নিয়মিত চিকিৎসা নেওয়ার পরও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে না এলে বিষয়টি আরও গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। এমন অবস্থাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ‘রেসিস্ট্যান্ট হাইপারটেনশন’ বা নিয়ন্ত্রণে কঠিন উচ্চ রক্তচাপ বলা হয়।

সাধারণভাবে অন্তত তিন ধরনের রক্তচাপের ওষুধ ব্যবহারের পরও রক্তচাপ ১৪০/৯০ মিমি পারদ বা তার বেশি থাকলে এমন অবস্থার কথা বিবেচনা করা হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, এ ধরনের রোগীদের হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক, কিডনি বিকল হওয়া এবং মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ন্ত্রিত রক্তচাপের ব্যক্তিদের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি হতে পারে।

কেন ওষুধ খেয়েও কমছে না রক্তচাপ?

উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে শুধু নতুন ওষুধ যোগ করা বা জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনা সবসময় যথেষ্ট নাও হতে পারে। চিকিৎসাধীন থাকার পরও প্রেসার বেশি থাকলে এর পেছনে অন্য কোনো কারণ রয়েছে কি না, তা খুঁজে দেখা জরুরি।

চিকিৎসকরা সাধারণত কয়েকটি বিষয় বিবেচনা করেন—ওষুধ সঠিক নিয়ম ও মাত্রায় খাওয়া হচ্ছে কি না, সঠিক পদ্ধতিতে রক্তচাপ মাপা হচ্ছে কি না এবং অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ, অতিরিক্ত ওজন, স্লিপ অ্যাপনিয়া, কিডনির সমস্যা কিংবা অন্য কোনো ওষুধ রক্তচাপ বাড়িয়ে দিচ্ছে কি না।

এ ছাড়া কিছু ক্ষেত্রে হরমোনের সমস্যাও অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপের কারণ হতে পারে।

অ্যালডোস্টেরনের ভূমিকা

নিয়ন্ত্রণে কঠিন উচ্চ রক্তচাপের অন্যতম সম্ভাব্য কারণ হতে পারে অ্যালডোস্টেরন নামের একটি হরমোনের অতিরিক্ত নিঃসরণ। শরীরে লবণ ও পানির ভারসাম্য বজায় রাখতে এই হরমোন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

তবে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি অ্যালডোস্টেরন তৈরি হলে শরীরে অতিরিক্ত সোডিয়াম ও পানি জমতে পারে। এর ফলে রক্তচাপ বেড়ে যেতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে রক্তনালি ও বিভিন্ন অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

তাই সাধারণ চিকিৎসায় রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে না এলে এর পেছনে হরমোনসহ কোনো নির্দিষ্ট শারীরিক কারণ রয়েছে কি না, তা পরীক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ।

জীবনযাত্রার পরিবর্তনও জরুরি

রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে লবণ কম খাওয়া, ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম, তামাক ও অ্যালকোহল এড়িয়ে চলা এবং পর্যাপ্ত ঘুমের গুরুত্ব রয়েছে।

তবে এসব পরিবর্তন করার পরও রক্তচাপ যদি দীর্ঘদিন বেশি থাকে, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। বর্তমানে উচ্চ রক্তচাপের চিকিৎসায় শুধু রক্তচাপের সংখ্যা কমানোর পাশাপাশি কেন তা নিয়ন্ত্রণে আসছে না, সেই কারণ শনাক্ত করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

শারীরিকভাবে সুস্থ অনুভব করলেই রক্তচাপ স্বাভাবিক আছে—এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক নয়। উচ্চ রক্তচাপ অনেক সময় কোনো দৃশ্যমান উপসর্গ ছাড়াই হৃদ্‌যন্ত্র ও অন্যান্য অঙ্গের ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

তাই নিয়মিত রক্তচাপ মাপা, চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ গ্রহণ এবং ওষুধ খাওয়ার পরও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে না এলে চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করা জরুরি।