বাংলাদেশে সঞ্চয় ও বিনিয়োগের কথা উঠলে সাধারণত ব্যাংক আমানত, সঞ্চয়পত্র কিংবা সরাসরি শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের কথাই সামনে আসে। তবে বয়স, আয়, করব্যবস্থা, ঝুঁকি নেওয়ার সক্ষমতা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা অনুযায়ী বিনিয়োগের ধরন ভিন্ন হতে পারে। এ ক্ষেত্রে বৈচিত্র্যময় বিনিয়োগের সুযোগ দিতে পারে মিউচুয়াল ফান্ড।

মিউচুয়াল ফান্ডে ছোট অঙ্কের নিয়মিত সঞ্চয়ও পেশাদার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে শেয়ারবাজার, সরকারি সিকিউরিটিজ, অন্যান্য অর্থবাজারের উপকরণ কিংবা শরিয়াহসম্মত সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ করা যায়। ফলে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সঞ্চয়কে দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক পুঁজিতে রূপ দেওয়ার একটি সুযোগ তৈরি হয়।

চার দশকের পথ, সম্ভাবনার তুলনায় বিস্তার কম

বাংলাদেশে মিউচুয়াল ফান্ডের যাত্রা চার দশকের বেশি সময়ের। ২০১৭ সালে অনলাইন বিনিয়োগের সুযোগ চালু হওয়ার পর এবং পরবর্তী সময়ে সিস্টেমেটিক ইনভেস্টমেন্ট প্ল্যান (এসআইপি) ও ডেট মিউচুয়াল ফান্ড চালুর মাধ্যমে খাতটি সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে পৌঁছাতে শুরু করে। তবে সম্ভাবনার তুলনায় দেশের মিউচুয়াল ফান্ডের বাজার এখনো সীমিত।

সম্প্রতি মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কর রেয়াতের সীমা ৫ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭৫ লাখ টাকা করা এবং তালিকাভুক্ত শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ডের লভ্যাংশে ১৫ শতাংশ চূড়ান্ত কর নির্ধারণের মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব উদ্যোগ খাতটির বিকাশে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। তবে সাধারণ মানুষের বিনিয়োগের মূলধারায় মিউচুয়াল ফান্ডকে আনতে আরও কিছু কাঠামোগত পরিবর্তন প্রয়োজন।

সহজ করতে হবে বিনিয়োগপ্রক্রিয়া

বর্তমানে মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগের একটি বড় অংশ এখনো কাগজনির্ভর ও ম্যানুয়াল ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান, সিডিবিএল, কাস্টডিয়ান ও ব্যাংকের মধ্যে প্রযুক্তিনির্ভর এপিআই-ভিত্তিক সংযোগ তৈরি করা গেলে বিনিয়োগপ্রক্রিয়া আরও দ্রুত ও সহজ করা সম্ভব।

একটি সমন্বিত ডিজিটাল ব্যবস্থার মাধ্যমে ব্যাংক ট্রান্সফার বা মোবাইল আর্থিক সেবায় ডিপিএস করার মতো সহজে মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করা গেলে আরও বড় জনগোষ্ঠীকে এই বাজারের সঙ্গে যুক্ত করা সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

শক্তিশালী করা দরকার বিক্রয় ও বিতরণব্যবস্থা

মিউচুয়াল ফান্ডের প্রসারে শুধু পণ্য তৈরি করাই যথেষ্ট নয়, বিনিয়োগকারীদের কাছে সেগুলোর বৈশিষ্ট্য ও ঝুঁকি সহজভাবে তুলে ধরাও জরুরি। কোন ফান্ডে কী ধরনের ঝুঁকি রয়েছে, সম্ভাব্য সুবিধা কী এবং কোন ধরনের বিনিয়োগকারীর জন্য কোন ফান্ড উপযোগী—এসব বিষয়ে তথ্য দিতে প্রয়োজন শক্তিশালী বিতরণব্যবস্থা ও প্রশিক্ষিত বিক্রয়কর্মী।

ভারতের মতো বাজারে বিধিমালায় নির্ধারিত মোট ব্যয় অনুপাতের সীমার মধ্যে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় বিক্রয় ও বিনিয়োগ-সচেতনতা কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশেও এ ধরনের কাঠামো থাকলে সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানগুলো বিনিয়োগকারীদের কাছে পৌঁছানো এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারী তৈরিতে আরও সক্রিয় হতে পারে।

বাড়তে পারে হাইব্রিড ফান্ডের পরিসর

বাংলাদেশের মিউচুয়াল ফান্ড খাতের বড় অংশ এখনো শেয়ারবাজারকেন্দ্রিক। কিন্তু সব বিনিয়োগকারীর ঝুঁকি নেওয়ার সক্ষমতা এক নয়। ফলে প্রচলিত ও শরিয়াহভিত্তিক—উভয় ধারাতেই শেয়ার ও বন্ড বা সুকুকের সমন্বয়ে সুস্পষ্ট হাইব্রিড ফান্ডের কাঠামো তৈরি করা গেলে বিনিয়োগের সুযোগ আরও বৈচিত্র্যময় হতে পারে।

এ ধরনের ফান্ড বিনিয়োগকারীদের নিজস্ব আর্থিক লক্ষ্য ও ঝুঁকি বিবেচনায় পণ্য বেছে নেওয়ার সুযোগ বাড়াতে পারে।

প্রয়োজন মানসম্পন্ন সিকিউরিটিজের সরবরাহ

মিউচুয়াল ফান্ডের বিকাশের সঙ্গে পুঁজিবাজারের গভীরতার বিষয়টিও সরাসরি যুক্ত। সাধারণ মানুষের সঞ্চয়কে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে রূপ দিতে হলে বাজারে পর্যাপ্ত ও বৈচিত্র্যময় মানসম্পন্ন শেয়ার এবং ডেট ইনস্ট্রুমেন্টের সরবরাহ প্রয়োজন।

বিনিয়োগের সুযোগ যত বৈচিত্র্যময় হবে, তত বেশি ধরনের বিনিয়োগকারীর চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যও বিভিন্ন ঝুঁকি ও মেয়াদের ফান্ড পরিচালনার সুযোগ তৈরি হবে।

ব্যক্তিশ্রেণির বিনিয়োগকারীর সঞ্চয় হতে পারে প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি

বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে ব্যক্তিশ্রেণির বিনিয়োগকারীর অংশগ্রহণ তুলনামূলকভাবে বেশি। প্রায় ৮৫ শতাংশ লেনদেন ব্যক্তিশ্রেণির বিনিয়োগকারীদের মাধ্যমে হয় বলে সংশ্লিষ্ট খাতের তথ্য থেকে জানা যায়। এই বিপুল সঞ্চয়ের একটি অংশ যদি পেশাদার সম্পদ ব্যবস্থাপনার আওতায় আনা যায়, তাহলে তা দীর্ঘমেয়াদে পুঁজিবাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগের ভিত্তি শক্তিশালী করতে পারে।

মিউচুয়াল ফান্ডের বিকাশ তাই শুধু একটি নির্দিষ্ট আর্থিক পণ্যের সম্প্রসারণ নয়। সহজ ও ডিজিটাল বিনিয়োগপ্রক্রিয়া, কার্যকর বিক্রয় ও বিতরণব্যবস্থা, বৈচিত্র্যময় ফান্ড এবং মানসম্পন্ন সিকিউরিটিজের সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে সাধারণ মানুষের সঞ্চয়কে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে রূপ দেওয়ার বড় সুযোগ তৈরি হতে পারে।