বন্ধের প্রক্রিয়ায় থাকা চারটি ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের (এনবিএফআই) ব্যক্তি আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে নতুন একটি স্কিম তৈরি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বৃহস্পতিবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান।
নতুন স্কিম অনুযায়ী, প্রাথমিকভাবে চার আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ব্যক্তি আমানতকারীরা ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত তাঁদের মূল আমানত পুরোপুরি ফেরত পাবেন। এর বেশি অর্থ জমা থাকলে নির্ধারিত হারে অতিরিক্ত অংশ কেটে বাকি টাকা ফেরত দেওয়া হবে।
বন্ধের প্রক্রিয়ায় থাকা চার প্রতিষ্ঠান হলো—আভিভা ফাইন্যান্স, ফারইস্ট ফাইন্যান্স, এফএএস ফাইন্যান্স এবং ইন্টারন্যাশনাল লিজিং। গত ৯ আগস্ট এসব প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদ বিলুপ্ত করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এরপর প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রশাসক নিয়োগ দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে প্রশাসকেরা প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পদ ও দায়ের বিস্তারিত হিসাব প্রস্তুত করছেন। প্রাথমিক পর্যায়ে সরকারের পক্ষ থেকে ব্যক্তি আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। পরবর্তী সময়ে প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পদ বিক্রি ও অন্যান্য পাওনা আদায়ের মাধ্যমে বাকি অর্থ ফেরতের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
কী আছে স্কিমে
স্কিম অনুযায়ী, ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত আমানত থাকলে ব্যক্তি আমানতকারী তাঁর পুরো মূল অর্থ ফেরত পাবেন। ৫০ লাখ থেকে ১ কোটি টাকা পর্যন্ত আমানত থাকলে সর্বোচ্চ ৮০ লাখ টাকা ফেরত দেওয়া হবে।
১ কোটি থেকে দেড় কোটি টাকা পর্যন্ত আমানত থাকলে প্রথম ১ কোটি টাকার জন্য ৮০ লাখ টাকা এবং অতিরিক্ত অংশের ৫০ শতাংশ ফেরত দেওয়া হবে। যেমন, কারও আমানত ১ কোটি ২০ লাখ টাকা হলে তিনি ৮০ লাখ টাকার সঙ্গে অতিরিক্ত ২০ লাখের ৫০ শতাংশ, অর্থাৎ ১০ লাখ টাকা পাবেন। মোট ফেরত পাবেন ৯০ লাখ টাকা।
দেড় কোটি থেকে ২ কোটি টাকা পর্যন্ত আমানত থাকলে প্রথম দেড় কোটি টাকার জন্য ১ কোটি ৫ লাখ টাকা এবং এর অতিরিক্ত অংশের ৪০ শতাংশ ফেরত দেওয়া হবে। যেমন, কারও আমানত ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা হলে প্রথম দেড় কোটি টাকার বিপরীতে পাবেন ১ কোটি ৫ লাখ টাকা। এর সঙ্গে অতিরিক্ত ৩০ লাখ টাকার ৪০ শতাংশ হিসেবে আরও ১২ লাখ টাকা পাবেন। অর্থাৎ মোট ১ কোটি ১৭ লাখ টাকা ফেরত পাবেন।
আর ২ কোটি টাকা বা তার বেশি আমানত থাকলে প্রথম ২ কোটি টাকার জন্য ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা এবং এর অতিরিক্ত অংশের ৩০ শতাংশ ফেরত দেওয়া হবে। যেমন, কারও আমানত ৩ কোটি টাকা হলে প্রথম ২ কোটি টাকার জন্য ১ কোটি ২৫ লাখ এবং অতিরিক্ত ১ কোটি টাকার ৩০ শতাংশ হিসেবে ৩০ লাখ টাকা পাবেন। সব মিলিয়ে ফেরত পাবেন ১ কোটি ৫৫ লাখ টাকা।
কার কত আমানত
বন্ধের প্রক্রিয়ায় থাকা চার আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মোট আমানতের পরিমাণ ১২ হাজার ৪৮৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে আভিভা ফাইন্যান্সে ৫ হাজার ৩৬৮ কোটি, ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ে ৩ হাজার ১২ কোটি, এফএএস ফাইন্যান্সে ১ হাজার ২৪৬ কোটি এবং ফারইস্ট ফাইন্যান্সে ৪৪৯ কোটি টাকা আমানত রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চার প্রতিষ্ঠানেই খেলাপি ঋণের পরিমাণ অত্যন্ত বেশি। প্রতিষ্ঠানগুলোর খেলাপি ঋণের হার ৯৩ শতাংশ থেকে প্রায় ১০০ শতাংশে পৌঁছেছে। দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক সংকট ও আমানতকারীদের অর্থ পরিশোধে জটিলতার পর এসব প্রতিষ্ঠান বন্ধের প্রক্রিয়ায় নেওয়া হয়েছে।
নতুন স্কিমের মাধ্যমে ব্যক্তি আমানতকারীদের অর্থ ফেরতের একটি নির্দিষ্ট কাঠামো তৈরি হলো। এখন প্রশাসকদের তৈরি করা সম্পদ ও দায়ের হিসাবের ভিত্তিতে পরবর্তী কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হবে।