যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যবর্তী সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতি এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে ডিজেল রপ্তানিতে সম্ভাব্য সরকারি নিষেধাজ্ঞার খবরের পর আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দামে বড় পতন দেখা গেছে। শুক্রবার লেনদেন শেষে বিশ্ববাজারে তেলের দাম প্রায় ২ শতাংশ কমেছে। তবে একই সাথে সৌদি আরবের ওপর হুতি বিদ্রোহীদের হামলার তীব্রতা বৃদ্ধি পাওয়ায় বৈশ্বিক তেল সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটার মারাত্মক ঝুঁকি ও আশঙ্কা রয়েই গেছে।
শুক্রবার আন্তর্জাতিক শেয়ারবাজার লেনদেন শেষে বিশ্বখ্যাত ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচারসের দাম ব্যারেলপ্রতি ২.২৮ ডলার বা ২.১ শতাংশ হ্রাস পেয়ে ১০৪.৩২ ডলারে নেমে দাঁড়িয়েছে। একই সাথে যুক্তরাষ্ট্রের বেঞ্চমার্ক ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট বা ডব্লিউটিআই (WTI)-এর দাম ব্যারেলপ্রতি ২.২০ ডলার বা ২.৩ শতাংশ কমে ৯২.৪১ ডলারে স্থির হয়েছে। সাপ্তাহিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ব্রেন্ট ক্রুডের দাম গড়ে ১ শতাংশেরও কম বাড়লেও ডব্লিউটিআইয়ের দর প্রায় ৮ শতাংশের মতো হ্রাস পেয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান গোপন আলোচনা ও হরমুজ প্রণালি নিউইয়র্কে মার্কিন ও ইরানি প্রতিনিধিদের মধ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি নিরসন ও সামরিক উত্তেজনা কমানোর লক্ষ্য নিয়ে ধাপে ধাপে একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর দ্বিপক্ষীয় আলোচনা চলছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র অনুযায়ী, চুক্তির অংশ হিসেবে ইরান কৌশলগত আন্তর্জাতিক নৌপথ 'হরমুজ প্রণালি' পুনরায় চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করতে পারে এবং বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর আরোপিত অর্থনৈতিক ও সামরিক অবরোধ তুলে নেওয়ার উদ্যোগ নিতে পারে।
তবে আলোচনা চললেও তেহরানের অনড় অবস্থানের কথা জানিয়েছেন এক জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা। তিনি জানান, হরমুজ প্রণালি খোলার প্রস্তাবে ওয়াশিংটন সম্মত হলেও নিজেদের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কোনো ধরনের আপস বা ছাড় দেবে না ইরান। ইরানি প্রস্তাবনার মধ্যে বন্দরগুলো ঘিরে রাখা মার্কিন নৌ অবরোধ সম্পূর্ণ তুলে নেওয়ার দাবি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
ডিজেল রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা ও অন্যান্য উপাদান ডিজেল বিদেশে পাঠানো বন্ধ হতে পারে এমন গুঞ্জন মার্কিন ও বিশ্ব তেল বাজারের দামে পার্থক্যের সৃষ্টি করেছে। বাজারে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে যে, ডিজেল রপ্তানি রুদ্ধ হলে যুক্তরাষ্ট্রের তেলের শোধনাগারগুলো ক্রুড বা অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়াকরণ উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কমিয়ে আনতে পারে। ফলশ্রুতিতে শুক্রবারে মার্কিন বাজারে পেট্রোলের ভবিষ্যত বা ফিউচার্স মূল্যসূচকও প্রায় ৪ শতাংশ কমেছে।
অন্যদিকে, ইরান যুদ্ধের পূর্বে বিশ্বের মোট জ্বালানি তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশই পরিবহন করা হতো অতি-গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে। বৈশ্বিক জ্বালানি সংক্রান্ত জাহাজ চলাচলের তথ্য প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান 'কেপলার'-এর প্রাথমিক সমীক্ষা বলছে, গত ২০ সেপ্টেম্বর শুরু হওয়া সপ্তাহে এই প্রণালি দিয়ে প্রায় ৩ কোটি ৩৭ লাখ ব্যারেল তেল পরিবাহিত হয়েছে, যা পূর্বের সপ্তাহের প্রবাাহের সাথেই সামঞ্জস্যপূর্ণ। এ ছাড়া সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইন পুনরায় চালু হওয়ায় বাজার কিছুটা স্বস্তি পেয়েছে, কারণ পাইপলাইনটি সরাসরি হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে লোহিত সাগরের মাধ্যমে সৌদি তেলের বিকল্প সরবরাহ নিশ্চিত করে।
সব মিলিয়ে একদিকে হুতিদের হামলার ভয় আর অন্যদিকে ওয়াশিংটন-তেহরান দরকষাকষির মধ্য দিয়ে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে এখনও অস্থির অনিশ্চয়তা বজায় রয়েছে।