নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলায় সাড়ে পাঁচ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন একটি সেতুর কাজে চরম অনিয়ম ও নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। রডের পরিবর্তে তার ব্যবহারের চাঞ্চল্যকর দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর তোলপাড় শুরু হলে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে ত্রুটিপূর্ণ কাজ ভেঙে অপসারণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

একই ঘটনায় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) এক প্রকৌশলীকে বদলিসহ দায়িত্বে অবহেলার কারণে দুই কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এছাড়া ঘটনার আসল চিত্র উদঘাটনে এক সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে আগামী তিন কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।

এলজিইডি নোয়াখালী কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বেগমগঞ্জ উপজেলার জমিদারহাট থেকে সাহেবেরহাট ও হাসানহাট হয়ে মাইজদী আঞ্চলিক মহাসড়কে ৪৯ দশমিক ০৬ মিটার দীর্ঘ আরসিসি ব্রিজের নির্মাণকাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয় ২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবর। শুরুতে মেসার্স হক ট্রেডার্স নামের একটি প্রতিষ্ঠান কাজটি পেলেও গত বছরের ৫ আগস্টের পর কাজটি হাতবদল হয়ে ৫ কোটি ৬১ লাখ টাকার নতুন ব্যয়ে মো. ফরহাদ নামের এক ঠিকাদার করা শুরু করেন।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, শুরু থেকেই ব্রিজের ফাইলিং ও অন্যান্য কাজে অনিয়ম ধরা পড়েছিল। তবে কাজের শেষভাগে এসে রাতে আঁধারে ব্রিজের ফুটপাতের স্ল্যাবে রডের পরিবর্তে পাতলা তার এবং অত্যন্ত নিম্নমানের সিমেন্ট দিয়ে ঢালাই করা হয়। দিনের বেলা পথচারীদের পা পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই ফুটপাতের স্লাব ও সেতুর রেলিং ভেঙে পড়তে থাকে।

অনিক নামের স্থানীয় এক তরুণ বলেন, “শুরু থেকেই অনিয়ম হচ্ছিল। আমরা এলজিইডিতে মৌখিকভাবে জানিয়েছি, ঠিকাদারের লোকজনকে দেখিয়ে দিয়েছি। কিন্তু তারা শোনেনি, রডের বদলে চিকন তার দিয়ে কাজ করেছে।”

মো. হাসান সোহেল নামে অপর এক বাসিন্দা জানান, “বেগমগঞ্জ, কবিরহাট ও সদর উপজেলার চার ইউনিয়নের হাজার হাজার মানুষ এই গুরুত্বপূর্ণ ব্রিজ দিয়ে জেলা শহরে যাতায়াত করবেন। এমন নিম্নমানের কাজে কালকে যদি কোনো দুর্ঘটনা ঘটে, তবে তার দায় কে নেবে?”

গত সোমবার নির্মাণকাজ সরেজমিন পরিদর্শন করেন এলজিইডির সুপারিনটেন্ডিং ইঞ্জিনিয়ার, ল্যাবরেটরি টেকনিশিয়ান ও সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারের প্রতিনিধিরা।

এলজিইডি নোয়াখালীর নির্বাহী প্রকৌশলী যুগল কৃষ্ণ মণ্ডল জানান, নকশা ও স্পেসিফিকেশন–বহির্ভূত নিম্নমানের কাজ দেখার পর তিনি নিজেই ঠিকাদারকে দ্রুত স্ল্যাব ও রেলিং অপসারণের নির্দেশ দেন। মঙ্গলবার এলজিইডি কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতেই নিম্নমানের অংশগুলো ভেঙে ফেলা হয়, যা স্থানীয়রা মোবাইলে ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেন।

নির্বাহী প্রকৌশলী আরও স্পষ্ট জানান, নকশা বহির্ভূত কোনো কাজের বিল পরিশোধ করা হবে না এবং আগামী সাত দিনের মধ্যে ভুল সংশোধন করে লিখিতভাবে জবাব দিতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স হক ট্রেডার্সকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এদিকে মেসার্স হক ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ ফজলুল হক দাবি করেন, কাজটি তাঁর লাইসেন্সে সেনবাগের ফরহাদসহ কয়েকজন মিলে করছেন। ঠিকাদার মো. ফরহাদ স্বীকার করে বলেন, “অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে কিছু ত্রুটি ধরা পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই তা ভেঙে ফেলা হয়েছে। নির্দেশনা অনুযায়ী নতুন করে কাজ করে দেওয়া হবে।”

কাজে গাফিলতির অভিযোগে বেগমগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশলী আবুল মনসুর আহমেদ ও উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. নাজমুল ইসলামকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। তবে কারণ দর্শানোর আগেই উপজেলা প্রকৌশলী আবুল মনসুর আহমেদকে রাঙামাটি জেলায় বদলি করা হয়েছে। এছাড়া উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. নাজমুল ইসলাম ও ওয়ার্ক অ্যাসিস্ট্যান্ট মো. মহিন উদ্দিনকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে।

পুরো ঘটনা তদন্তে নোয়াখালী অঞ্চলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এ.এস.এম মহসীনকে নিয়ে এক সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তিন কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার বিষয়ে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এ.এস.এম মহসীন জানান, “সরেজমিনে প্রাথমিক অনিয়ম ধরা পড়েছে, রোববারের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে।”