ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) নির্বাচনে সাদিক কায়েমের বিজয়কে একসময় ভারতীয় আধিপত্যবাদ বিরোধী শক্তি ও 'নিজেদের বিজয়' হিসেবে দেখলেও, বর্তমানে তাঁর নেতৃত্বে বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত বিভিন্ন কর্মকাণ্ড—বিশেষ করে নারীদের খেলাধুলায় পোশাকের স্বাধীনতা ও উপস্থাপনা নিয়ে প্রকাশ্য প্রশ্ন তুলেছেন আলোচিত ইসলামি বক্তা রফিকুল ইসলাম মাদানী।
শনিবার (২৫ অক্টোবর) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে নিজের ভেরিফাইড আইডি থেকে দেওয়া এক দীর্ঘ স্ট্যাটাসে এসব বিষয়ে বিস্তারিত খোলামেলা মন্তব্য করেন তিনি।
শুরুর সমর্থন ও সার্বিক ভূমিকার প্রশংসা স্ট্যাটাসে রফিকুল ইসলাম মাদানী উল্লেখ করেন, ডাকসুতে সাদিক কায়িম জয়ী হওয়ার পর তিনি নিজে অত্যন্ত উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছিলেন এবং ফলাফল ঘোষণার রাতে সারারাত সজাগ থেকে পরিস্থিতির ওপর চোখ রেখেছিলেন, যার প্রমাণ তাঁর আইডিতে পুরোনো পোস্টগুলোতে এখনো বিদ্যমান।
তিনি লেখেন, "কারণ একটাই—এ বিজয়কে ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরোধী শক্তির বিজয় মনে করেছিলাম, নিজেদের বিজয় মনে করেছিলাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের আন্দোলন-সংগ্রামের সূতিকাগার; জুলাই আন্দোলনও এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই শুরু হইছে। তাই এখানে শিবিরের হাতে ক্ষমতা থাকা মানে দিল্লির জন্য বিশাল ভয়—আর সে কারণেই খুশি হয়েছিলাম।"
সাদিক কায়িম ও এস এম ফরহাদদের ইতিবাচক নানা কাজের কথা স্মরণ করে তিনি আরও বলেন, হলে সিট বাণিজ্য বন্ধ করা, যোগ্যতা অনুযায়ী সাধারণ শিক্ষার্থীদের সিট দেওয়া, বৃষ্টির দিনে নারী শিক্ষার্থীদের জন্য ভেনগাড়ি ও আলাদা বাসের ব্যবস্থা করা এবং গরমের দিনে সুপেয় পানির ব্যবস্থা করার মতো উদ্যোগগুলো অবশ্যই প্রশংসনীয়।
তবে এর সাথে দ্বিমত প্রকাশ করে তিনি প্রশ্ন তোলেন, "কিন্তু প্রশ্ন হলো—আমরা তো মুসলিম, আমরা কি শুধুমাত্র এসব কাজের জন্য কাউকে সাপোর্ট করতে পারি? নাকি দুনিয়ার সকল সুযোগ-সুবিধার চেয়েও আমাদের কাছে আল্লাহর বিধান বড়?"
পোশাক ও বিতর্কিত আয়োজন নিয়ে আপত্তি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কোনো পুরোপুরি ইসলামিক জায়গা নয় এবং সব নারী শিক্ষার্থী পর্দা করেন না—সুতরাং তাঁদের বাস্কেটবল খেলা নিয়ে আপত্তির কারণ কী হতে পারে, সেই প্রসঙ্গে ব্যাখ্যামূলক স্ট্যাটাসে মাদানী লেখেন, "বিষয়টা শুধুমাত্র খেলার নয়, বিষয়টা হলো শর্ট প্যান্ট ও টাইট ফিটিং গেঞ্জি পরে মেয়েদের খেলার আয়োজন করে সেটাকে প্রকাশ্যে উৎসাহ ও গর্বের সঙ্গে উপস্থাপন করা। আরমান নামে একজন আয়োজকের জন্য হাত তালি দিতে বলা! সমস্যাটা ঠিক এই জায়গায়।"
তিনি আরও যুক্তি দেন যে, সাদিক কায়িমকে অসংখ্য নারী শিক্ষার্থী অনুসরণ করেন এবং নেতা মনে করেন। সাদিক কায়িমকে যখন শায়েখ আহমদুল্লাহ, শায়েখ মিজানুর রহমান আজহারী, শায়েখ মামুনুল হক, আব্দুল হাই মুহাম্মদ সাইফুল্লাহসহ দেশের শীর্ষস্থানীয় আলেমদের সঙ্গে এবং জামায়াতের আমিরের সঙ্গে বিভিন্ন প্রোগ্রামে সমর্থিত হতে দেখা যায়, তখন সাধারণ অনুসারীরা তাঁর কর্মকাণ্ডকে ইসলামের দৃষ্টিতে সঠিক বলে ধরে নিতে পারেন।
একই সাথে তিনি মারজিয়া মমতাজের মতো মহিলা শাখার প্রতিনিধিরা টকশোতে নারীদের শর্ট প্যান্ট পরা নিয়ে দেওয়া বক্তব্যের সমালোচনা করে বলেন, এতে করে সরলমনা নারীরা এসব বিষয়কে ইসলামে বৈধ বা 'জায়েজ' বলে ভুল ধারণা পেতে পারেন।
শীর্ষ আলেমদের এগিয়ে আসার আহ্বান ও আদর্শিক অবস্থান পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় রফিকুল ইসলাম মাদানী দেশের শীর্ষস্থানীয় ইসলামি ব্যক্তিত্ব ও শায়েখদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, "আপনাদের বলব—প্লিজ, এই বিষয়ে সুস্পষ্ট কথা বলুন। কারণ যেসব মেয়েরা সাদিক কায়িমকে ফলো করে, তাদের কাছে আমাদের হুজুরদের আওয়াজও পৌঁছে না। তাই আপনারা এই বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা তুলে ধরুন যাতে সাদিক কায়িমসহ সকলেই সতর্ক হতে পারে!"
স্ট্যাটাসের শেষের দিকে আদর্শিক সূক্ষ্মতার ওপর জোর দিয়ে মাদানী মন্তব্য করেন, কেবল পরিকাঠামোগত বা বাহ্যিক উন্নয়নই কোনো নেতৃত্বের মূল বিবেচ্য হতে পারে না; কারণ শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ সরকারও অনেক তথাকথিত উন্নয়ন করেছিল।
তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে লেখেন, "এপস্টিন ফাইলে জড়িত কুখ্যাত নরপিশাচ আমেরিকা ও পশ্চিমের কাছে নিজেদের প্রগতিশীল প্রমাণ করে ক্ষমতায় আসার চেষ্টা যদি ইসলামের মৌলিক বিষয়গুলোকে গৌণ করে দেয়, তাহলে কাকতালীয় ভাবে সেই ক্ষমতা যদি এসেও যায় সেটা ইসলামের পক্ষের হবে না, ফায়দাও হবে না। আর তখন সেই ক্ষমতার বিরুদ্ধে আমাদের স্পষ্ট অবস্থানও থাকবে, ইনশাআল্লাহ।"
প্রতিবেদনটি লেখার সময় পর্যন্ত রফিকুল ইসলাম মাদানীর ওই ফেসবুক পোস্টটিতে প্রায় আড়াই হাজার নেটিজেন রিয়্যাকশন প্রকাশ করেছেন।