জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ক্রমেই বদলে যাচ্ছে পৃথিবীর আবহাওয়ার ধরন। এরই মধ্যে প্রশান্ত মহাসাগরে শক্তিশালী হয়ে ওঠা এল নিনো এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চ তাপমাত্রা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করছে বিজ্ঞানীদের মধ্যে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা বা ডব্লিউএমওর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালের শেষ দিকে এল নিনো আরও তীব্র হয়ে উঠতে পারে। এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়তে পারে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের আবহাওয়া, কৃষি, অর্থনীতি ও সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রে। এমনকি এর প্রভাব ২০২৭ সাল পর্যন্ত স্থায়ী হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।

প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্ব নিরক্ষীয় অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার ঘটনাকে বলা হয় এল নিনো। এটি এল নিনো–সাউদার্ন অসিলেশন বা ইএনএসও নামের বৃহত্তর জলবায়ু চক্রের একটি অংশ। এল নিনোর সময় স্বাভাবিক বাণিজ্যিক বায়ুপ্রবাহ বা ট্রেড উইন্ড দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে উষ্ণ সমুদ্রের পানি পূর্ব দিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং বায়ুমণ্ডলের স্বাভাবিক সঞ্চালনব্যবস্থায় পরিবর্তন ঘটে। এর প্রভাবে কোনো অঞ্চলে দেখা দিতে পারে তীব্র খরা, আবার কোথাও বাড়তে পারে অতিবৃষ্টি ও বন্যার ঝুঁকি। পাশাপাশি মানুষের কর্মকাণ্ড থেকে নির্গত গ্রিনহাউস গ্যাস বায়ুমণ্ডলে তাপ আটকে রাখছে। এই অতিরিক্ত তাপের বড় একটি অংশ শোষণ করছে মহাসাগরগুলো, যার ফলে সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধির উদ্বেগ আরও বাড়ছে।

তবে জলবায়ুর এই পরিবর্তন পর্যবেক্ষণে বিজ্ঞানীরা এগিয়ে নিচ্ছেন নতুন প্রযুক্তি। নেচার জিওসায়েন্স সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও স্যাটেলাইটের ছবি ব্যবহার করে সমুদ্রের উপরিভাগের স্রোতের মানচিত্র তৈরির নতুন পদ্ধতির কথা তুলে ধরা হয়েছে। জিওস্টেশনারি ওশান ফ্লো বা জিওফ্লো নামের এই প্রযুক্তির সাহায্যে সমুদ্রের স্রোতের গতিবিধি আরও সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হচ্ছে। আটলান্টিক মহাসাগরের গালফ স্ট্রিমে এই পদ্ধতি প্রয়োগ করে বিজ্ঞানীরা ছোট আকারের স্রোতগুলোর বৈশিষ্ট্যও শনাক্ত করেছেন। এসব স্রোত সমুদ্রের তাপ, পুষ্টি উপাদান ও কার্বনের আদান-প্রদানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

বিজ্ঞানীদের মতে, সমুদ্রের তাপমাত্রা ও স্রোতের পরিবর্তন সম্পর্কে আরও নির্ভুল তথ্য পাওয়া গেলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বোঝা এবং ভবিষ্যতের আবহাওয়ার পূর্বাভাস উন্নত করা সহজ হবে। একই সঙ্গে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের ওপর সম্ভাব্য ঝুঁকি নিরূপণেও সহায়ক হবে এই প্রযুক্তি। সব মিলিয়ে, শক্তিশালী এল নিনো এবং উষ্ণ হয়ে ওঠা মহাসাগর পৃথিবীর জলবায়ুর জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। আর সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সমুদ্রের গভীর থেকে উঠে আসা প্রতিটি সংকেত এখন বিজ্ঞানীদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।