তিস্তার পানির ওঠানামা, পাকা ধান ঘরে তোলা নিয়ে চরের কৃষকের শঙ্কা। একদিকে সোনালি ধানে ভরে উঠেছে তিস্তার চর, অন্যদিকে নদীর পানির ওঠানামায় সেই সোনালি স্বপ্নেই যেন ভর করছে শঙ্কার কালো মেঘ। রংপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা ও নীলফামারীর তিস্তা-বেষ্টিত প্রায় ১৮০টি চরের কৃষকের এখন একটাই চিন্তা - ফসল ঘরে তোলার ঠিক আগমুহূর্তে পানি বেড়ে গেলে তলিয়ে যেতে পারে পাকা আমন ধান।
কারণ, চরাঞ্চলের অনেক আবাদি জমিই নদীর কাছাকাছি এবং নিচু এলাকায়। ফলে তিস্তার পানি হঠাৎ বাড়লে মুহূর্তেই প্লাবিত হতে পারে এসব জমি। কয়েক দিনের মধ্যেই যেখানে কাস্তের ঝনঝন শব্দে ধান কাটার উৎসব শুরু হওয়ার কথা, সেখানে এখন নদীর গতিপথের দিকে তাকিয়ে উৎকণ্ঠায় সময় কাটছে কৃষকদের।
তবে আশার জায়গাটিও আছে। চলতি মৌসুমে পাঁচ জেলার ১৮০টি চরে প্রায় ২২ হাজার ৮০০ হেক্টর জমিতে আমন আবাদ হয়েছে, ফলনও হয়েছে বেশ ভালো। কৃষি বিভাগের পরামর্শ, আগাম জাতের যেসব ধান পাকতে শুরু করেছে, সেগুলো আর দেরি না করে দ্রুত কেটে ঘরে তুলতে হবে। অর্থাৎ ‘সাবধানের মার নেই’ - ঝুঁকি এড়াতে আগেভাগেই প্রস্তুতি নিতে চাইছে কৃষি বিভাগ।
আর এই তাগিদ আসছে আগের অভিজ্ঞতা থেকেই। সাধারণত অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে তিস্তার পানি ওঠানামার প্রবণতা দেখা যায়। গত কয়েক বছরেও ফসল ঘরে তোলার সময় নদীর পানি বেড়ে পাকা ধান তলিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। তাই এবারও নদীর আচরণ নিয়ে সতর্ক কৃষক ও কৃষি কর্মকর্তারা - কারণ প্রকৃতির খেয়ালে এক মুহূর্তেই নষ্ট হতে পারে মাসের পর মাসের শ্রম।
সেই আশঙ্কাই যেন কৃষক জাহেদুল ইসলামের কথায় আরও স্পষ্ট। তার ভাষায়, প্রয়োজনের সময় নদীতে পানি থাকে না, অথচ ফসল ঘরে তোলার সময় এলেই পানির বাড়বাড়ন্ত শুরু হয়। একই দুশ্চিন্তা সাইফুল ইসলামেরও - সারা বছরের পরিশ্রমে ফলানো ধান এখন শুধু ঘরে তোলার অপেক্ষায়, এই শেষ সময়ে পানি বাড়লে বড় ক্ষতির মুখে পড়তে হবে তাদের।
আর সেই ক্ষতির স্মৃতি এখনো তাড়া করছে ভোটমারী চরের কৃষক সাহানুর রহমানকে। গত বছর তিস্তার পানিতে তার সাড়ে তিন বিঘা জমির ধান নষ্ট হয়েছিল। এবার সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে সাত বিঘা জমিতে আমন চাষ করেছেন তিনি। তাই তার মতো কৃষকদের প্রত্যাশা, ধান ঘরে না ওঠা পর্যন্ত তিস্তার পানির গতিবিধি যেন নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয় এবং পানি বাড়ার আভাস মিললেই দ্রুত সতর্ক করা হয় চরবাসীকে।
সব মিলিয়ে তিস্তার পাড়ে এখন আনন্দ আর আতঙ্ক পাশাপাশি হাঁটছে। মাঠজুড়ে পাকা ধানের সোনালি হাসি, কিন্তু সেই হাসি ঘরে তুলতে হলে সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিতে হবে কৃষকদের। কৃষি বিভাগও দিচ্ছে দ্রুত ধান কাটার পরামর্শ এবং পানি বৃদ্ধির আশঙ্কা দেখা দিলে আগাম সতর্ক করার আশ্বাস। এখন কৃষকের একটাই প্রার্থনা - তিস্তা যেন এবার আর সোনালি ফসলের স্বপ্নে কালো ছায়া না ফেলে।