২০১৬ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে প্রতিবছর গড়ে প্রায় ২০ লাখ মানুষ শ্রমবাজারে প্রবেশ করেছেন। বিপরীতে নতুন কাজ তৈরি হয়েছে মাত্র প্রায় ৯ লাখ। এর মধ্যে প্রতি ১০টি নতুন কাজের প্রায় ৭টিই হয়েছে কৃষিতে। শিল্প খাতে বরং কর্মসংস্থান কমেছে।
বিশ্বব্যাংকের ২০২৬ সালের বাংলাদেশ উন্নয়ন হালনাগাদ প্রতিবেদনের বিশেষ অধ্যায়ে এসব তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত এক দশকে বাংলাদেশের অর্থনীতি গড়ে ৬ শতাংশ হারে বাড়লেও উৎপাদনশীলতা, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সেই অনুপাতে বাড়েনি।
নারীদের কর্মসংস্থানের পরিস্থিতি আরও দুর্বল। ২০১৬ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে কৃষিতে নারীদের জন্য ৪২ লাখ নতুন কাজ তৈরি হলেও শিল্পে ১১ লাখ এবং সেবা খাতে ৮ লাখ কাজ কমেছে। একই সময়ে নারীর শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণ ৪২ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে কমে ৩৮ দশমিক ৪ শতাংশে নেমেছে।
অল্প প্রতিষ্ঠানের হাতে বিক্রি ও রপ্তানি
উৎপাদনশীলতায় শীর্ষ ১০ শতাংশ প্রতিষ্ঠানকে ‘ফ্রন্টিয়ার প্রতিষ্ঠান’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে বিশ্বব্যাংক। ২০২২ সালে আনুষ্ঠানিক খাতের মোট বিক্রির প্রায় ৭৫ শতাংশ এবং রপ্তানি আয়ের ৬৯ শতাংশ এসেছে এসব প্রতিষ্ঠান থেকে। অথচ আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানে তাদের অংশ মাত্র ১৫ শতাংশ।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানগুলোর বড় হওয়ার পথে জটিল সরকারি প্রক্রিয়া, অর্থায়নের সংকট, অসম প্রতিযোগিতা ও বিদ্যুৎ-বিভ্রাট বড় বাধা।
সরকারি নিয়মকানুন সামলাতে প্রতিষ্ঠানের জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপকদের গড়ে ১৩ শতাংশ সময় ব্যয় হয়। একটি নির্মাণ অনুমোদন বা আমদানি লাইসেন্স পেতে গড়ে ৪৯ দিন লাগে। নিয়মকানুনের চাপ বেশি থাকা প্রতিষ্ঠানের স্থায়ী সম্পদে বিনিয়োগের সম্ভাবনাও প্রায় ১৯ শতাংশ কম।
বিদ্যুৎ-বিভ্রাটে বড় ক্ষতি
ব্যবসার অন্যতম বড় বাধা অনির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ। প্রায় ৭১ শতাংশ প্রতিষ্ঠান বিদ্যুৎ-বিভ্রাটের মুখে পড়ে এবং একটি প্রতিষ্ঠানকে মাসে গড়ে ২৬ বার এ সমস্যা সামলাতে হয়। এতে বার্ষিক বিক্রির প্রায় ৯ শতাংশ ক্ষতি হয়।
অর্থায়নের ক্ষেত্রেও সংকট রয়েছে। প্রায় ২২ শতাংশ প্রতিষ্ঠান আংশিক এবং ৮ শতাংশ পুরোপুরি ঋণসুবিধা থেকে বঞ্চিত। ফলে প্রযুক্তি গ্রহণ, বিনিয়োগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
কর ও রাষ্ট্রীয় সুবিধায় বৈষম্য
বিশ্বব্যাংকের মতে, করছাড়, কম সুদের ঋণ ও অন্যান্য রাষ্ট্রীয় সুবিধার বড় অংশ অল্প কিছু প্রতিষ্ঠানের হাতে কেন্দ্রীভূত। ২০২১ সালে করপোরেট করছাড়ে সরকারের রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে জিডিপির প্রায় ২ দশমিক ৪ শতাংশ।
তৈরি পোশাক খাতসহ কিছু খাত বিশেষ সুবিধা পেলেও অন্য প্রতিষ্ঠান তুলনামূলক বেশি কর ও শুল্কের মুখে পড়ে। এতে বাজারে প্রতিযোগিতার পরিবেশও অসম হয়ে উঠছে।
প্রয়োজন ব্যবসাবান্ধব সংস্কার
বিশ্বব্যাংক ব্যবসার অনুমোদন ও সরকারি সেবা সহজ করা, ওয়ান-স্টপ সেবা কার্যকর করা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানের অর্থায়ন বাড়ানো এবং রাষ্ট্রীয় সুবিধা দেওয়ার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার পরামর্শ দিয়েছে।
একই সঙ্গে সব প্রতিষ্ঠানের জন্য সমান প্রতিযোগিতার পরিবেশ, দ্রুত বাণিজ্যিক বিরোধ নিষ্পত্তি এবং বড় দেশীয় ও বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের সরবরাহব্যবস্থায় ছোট প্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের মূল মূল্যায়ন—শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নয়, উৎপাদনশীলতা ও কর্মসংস্থান বাড়াতে হলে প্রতিযোগিতা, স্বচ্ছতা ও ব্যবসার পরিবেশে কাঠামোগত সংস্কার জরুরি।