একসময় তাঁর কণ্ঠ শুনে পরিবারের একজন বলেছিলেন, এই মেয়েই একদিন পরিবারের ভাগ্য বদলে দেবে। কথাটি যে এত দ্রুত সত্যি হয়ে যাবে, তখন হয়তো কেউ ভাবেননি। মাত্র ছয় বছর বয়সে সংগীতের তালিম শুরু। এরপর মঞ্চে গান, শিশুশিল্পী হিসেবে চলচ্চিত্রে অভিষেক, আর ধীরে ধীরে নায়িকা ও গায়িকা হিসেবে প্রতিষ্ঠা। মুম্বাইয়ের চলচ্চিত্রজগতে এমন জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন যে ১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় ভারত ছাড়ার সিদ্ধান্ত তাঁর জীবনের মোড়ই বদলে দেয়। পেছনে পড়ে থাকে প্রতিষ্ঠিত এক তারকার জীবন, সামনে অপেক্ষা করছিল সম্পূর্ণ নতুন এক অধ্যায়।
নতুন দেশ পাকিস্তানে গিয়ে তাঁকে আবার শুরু করতে হয়েছিল। তখন দেশটির নিজস্ব চলচ্চিত্রশিল্পও ছিল একেবারে শুরুর পর্যায়ে। কিন্তু নূরজাহান শুধু অভিনয় কিংবা গানেই থেমে থাকেননি। প্রযোজনা করেছেন, স্টুডিও গড়েছেন, পরিচালনায় এসেছেন এবং নিজের পারিশ্রমিকও নিজেই নির্ধারণ করেছেন। পরে অভিনয় ছেড়ে পুরোপুরি সংগীতে মন দেন। আর সেই কণ্ঠই তাঁকে এমন উচ্চতায় নিয়ে যায়, যেখানে তাঁর নামের সঙ্গে স্থায়ীভাবে যুক্ত হয় ‘মালিকা-ই-তারান্নুম’—সুরের রানি।
আজ নূরজাহানের জন্মের ১০০ বছর। ১৯২৬ সালের ২১ সেপ্টেম্বর ব্রিটিশ ভারতের পাঞ্জাবের কাসুরে জন্মেছিলেন তিনি। সংগীত পরিবারে বেড়ে ওঠা এই শিল্পী পরবর্তী সময়ে শুধু পাকিস্তানের নয়, পুরো দক্ষিণ এশিয়ার সংগীত ও চলচ্চিত্রের ইতিহাসে নিজের আলাদা জায়গা তৈরি করেন।
ছয় বছর বয়সেই সংগীতে হাতেখড়ি
নূরজাহানের জন্ম এমন এক পরিবারে, যেখানে সংগীত ছিল জীবনেরই অংশ। তাঁর বাবা মাদাদ আলী সংগীতের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরিবারের আরও কয়েকজন নারী মঞ্চে কাজ করতেন। ছোট বয়সেই নূরজাহানের কণ্ঠে সম্ভাবনা দেখতে পান পরিবারের সদস্যরা। ছয় বছর বয়স থেকে শুরু হয় তাঁর সংগীতের আনুষ্ঠানিক তালিম। পরে কলকাতায় গিয়ে সংগীত ও মঞ্চের আরও বড় পরিসরের সঙ্গে পরিচিত হন তিনি।
শিশুশিল্পী হিসেবে তখনই পরিচিতি তৈরি হয় ‘বেবি নূরজাহান’ নামে। মঞ্চের পাশাপাশি চলচ্চিত্রেও শুরু হয় তাঁর কাজ। ১৯৩৫ সালের ‘পিন্ড দি কুড়ি’ ছবিতে শিশুশিল্পী হিসেবে অভিনয় করেন তিনি। এরপর পাঞ্জাবি ও উর্দু চলচ্চিত্রে তাঁর কাজ বাড়তে থাকে।
যে বয়সে অন্য শিশুরা স্কুল আর খেলাধুলা নিয়ে ব্যস্ত, সেই বয়সেই নূরজাহানের দিন কাটছিল স্টুডিও, মঞ্চ, রেকর্ডিং আর ক্যামেরার সামনে। তাঁর ক্যারিয়ারও তাই অন্যদের তুলনায় অনেক দ্রুত এগিয়ে যায়।
১৯৩৮ সালে ‘গুল বাকাওলি’ ছবির জন্য গান রেকর্ড করেন নূরজাহান। চলচ্চিত্রে গানের জগতে এটি ছিল তাঁর শুরুর দিকের গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। পরবর্তী কয়েক দশকে সেই কণ্ঠই হয়ে ওঠে তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয়।
মুম্বাইয়ে তারকা হয়ে ওঠা
কলকাতার পর নূরজাহানের ক্যারিয়ার তাঁকে নিয়ে যায় লাহোর ও মুম্বাইয়ে। চল্লিশের দশকে মুম্বাই ছিল ভারতীয় চলচ্চিত্রের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। সেখানে গিয়ে শিশুশিল্পীর পরিচয় পেছনে ফেলে পূর্ণাঙ্গ নায়িকা ও গায়িকা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেন তিনি।
১৯৪২ সালের ‘খানদান’ তাঁর ক্যারিয়ারে বড় পরিবর্তন আনে। অভিনয়ের পাশাপাশি ছবিতে তাঁর গাওয়া গানও দর্শকের কাছে জনপ্রিয় হয়। এরপর ‘জিনাত’, ‘আনমোল ঘড়ি’ ও ‘জুগনু’র মতো ছবিতে অভিনয় করে তিনি উঠে আসেন তৎকালীন চলচ্চিত্রের প্রথম সারির তারকাদের মধ্যে।
১৯৪৫ সালের ‘জিনাত’-এর ‘বুলবুলো মাত রো’ গানটি তাঁকে বিশেষভাবে আলোচনায় নিয়ে আসে। ‘আনমোল ঘড়ি’তে অভিনয় ও গানের মাধ্যমে জনপ্রিয়তা আরও বাড়ে। আর ১৯৪৭ সালের ‘জুগনু’তে দিলীপ কুমারের বিপরীতে অভিনয় তাঁকে তখনকার ভারতীয় চলচ্চিত্রের পরিচিত মুখে পরিণত করে।
কিন্তু ঠিক সেই সময়েই বদলে যায় উপমহাদেশের ইতিহাস, বদলে যায় নূরজাহানের জীবনও।
দেশভাগে বদলে গেল সব
১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের পর স্বামী ও চলচ্চিত্র পরিচালক শওকত হুসেইন রিজভিকে সঙ্গে নিয়ে পাকিস্তানে চলে যান নূরজাহান। সিদ্ধান্তটি সহজ ছিল না। কারণ, ভারতে তখন তিনি প্রতিষ্ঠিত তারকা। বিপরীতে পাকিস্তানে তখনো চলচ্চিত্রশিল্প শক্ত ভিত্তি তৈরি করতে পারেনি।
লাহোরকে চলচ্চিত্রের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা চলছিল, কিন্তু শিল্পী, প্রযুক্তিবিদ, প্রযোজক ও অর্থ—সব ক্ষেত্রেই ছিল সীমাবদ্ধতা। এমন পরিস্থিতিতে নূরজাহান সেখানে গিয়ে আবার নতুন করে পথ তৈরি করেন।
এবার তিনি শুধু অভিনয়শিল্পী নন, চলচ্চিত্র নির্মাণের বিভিন্ন ক্ষেত্রেও যুক্ত হলেন। ১৯৫১ সালে মুক্তি পায় ‘চানভে’। ছবিতে অভিনয় ও গান করার পাশাপাশি পরিচালনার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন তিনি। এর মাধ্যমে পাকিস্তানের প্রথম নারী চলচ্চিত্র পরিচালক হিসেবে তাঁর নাম ইতিহাসে জায়গা করে নেয়।
নায়িকা থেকে সংগীতের সম্রাজ্ঞী
‘চানভে’র পর ‘দুপাট্টা’, ‘পাতে খান’, ‘ইন্তেজার’, ‘আনারকলি’ ও ‘কোয়েল’-এর মতো ছবিতে অভিনয় করেন নূরজাহান। তবে পঞ্চাশের দশকের শেষ দিকে এসে তিনি বুঝতে পারেন, পর্দায় তাঁর উপস্থিতির চেয়েও দর্শক তাঁর কণ্ঠের জন্য বেশি অপেক্ষা করেন।
তাই অভিনয় থেকে সরে গিয়ে পুরোপুরি সংগীতে মন দেন। ১৯৫৯ সালের পর তাঁর অভিনয়জীবন কার্যত শেষ হয়ে যায়। এরপর নূরজাহানের কণ্ঠই হয়ে ওঠে তাঁর প্রধান পরিচয়।
এটি ছিল সাহসী এক সিদ্ধান্ত। জনপ্রিয় নায়িকার জায়গা ছেড়ে শুধু সংগীতকে বেছে নেওয়া তখন সহজ ছিল না। কিন্তু নিজের কণ্ঠের শক্তি সম্পর্কে নূরজাহানের আত্মবিশ্বাস ছিল স্পষ্ট। পরবর্তী সময়ে সেই সিদ্ধান্তই তাঁকে এমন এক উচ্চতায় নিয়ে যায়, যেখানে তিনি শুধু চলচ্চিত্রের গায়িকা নন, পাকিস্তানের সংগীতজগতের অন্যতম প্রধান কিংবদন্তি হয়ে ওঠেন।
নিজের পারিশ্রমিক নিজেই ঠিক করতেন
নিজের জনপ্রিয়তা ও শিল্পমূল্য সম্পর্কে নূরজাহান ছিলেন যথেষ্ট সচেতন। পাকিস্তানি চলচ্চিত্রে যখন অন্য অনেক গায়িকা একটি গানের জন্য প্রায় ৩৫০ রুপি পারিশ্রমিক পেতেন, তখন নূরজাহান দাবি করতেন প্রায় ২ হাজার রুপি। অর্থাৎ ব্যবধান ছিল প্রায় পাঁচ গুণ।
তাঁর কাছে বিষয়টি শুধু অর্থের ছিল না; নিজের শিল্পের মূল্য কতটা, সেটি তিনি নিজেই নির্ধারণ করতে চাইতেন। পুরুষপ্রধান চলচ্চিত্রশিল্পে এই আত্মবিশ্বাস তাঁকে সমসাময়িক অনেক শিল্পীর চেয়ে আলাদা করে তুলেছিল।
নিজের স্টুডিও ও কাজের জায়গাতেও তিনি ছিলেন দৃঢ়চেতা। প্রযোজনা থেকে অভিনয়, গান থেকে পরিচালনা—শিল্পের নানা ক্ষেত্রে নিজের সিদ্ধান্ত নিজেই নেওয়ার চেষ্টা করেছেন।
ব্যক্তিজীবনও ছিল ঘটনাবহুল
মাত্র ১৭ বছর বয়সে চলচ্চিত্র পরিচালক শওকত হুসেইন রিজভিকে বিয়ে করেন নূরজাহান। কাজের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল তাঁদের সম্পর্ক। তাঁদের সংসারে সন্তানও আসে। তবে পরবর্তী সময়ে সেই দাম্পত্য ভেঙে যায়।
১৯৫৯ সালে অভিনেতা এজাজ দুররানিকে দ্বিতীয়বার বিয়ে করেন তিনি। এই সময়ের পর তাঁর অভিনয়জীবনও শেষের দিকে চলে আসে। বিভিন্ন জীবনীমূলক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দ্বিতীয় স্বামী তাঁর অভিনয় চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে আগ্রহী ছিলেন না।
তবে পর্দা থেকে সরে গেলেও সংগীত থেকে কখনো দূরে যাননি নূরজাহান। বরং তখনই তাঁর কণ্ঠ আরও স্বাধীনভাবে বিকশিত হয়। ছয় সন্তানের মা হয়েও নিজের পেশাগত পরিচয় ধরে রেখেছিলেন তিনি।
ফয়েজের কবিতা থেকে যুদ্ধের গান
নূরজাহানের কণ্ঠের বড় বৈশিষ্ট্য ছিল, তিনি শুধু সুর গাইতেন না—গানের কথার আবেগও তুলে ধরতে পারতেন। এ কারণেই কবিতা ও গানের জগতে তাঁর কাজ এত স্মরণীয় হয়ে আছে।
ফয়েজ আহমেদ ফয়েজের ‘মুঝসে পেহলি সি মোহাব্বত’ তাঁর কণ্ঠে বিশেষ জনপ্রিয়তা পায়। প্রেম, বেদনা ও সামাজিক অনুভূতির মিশেল গানটিকে আলাদা মাত্রা দেয়।
তবে নূরজাহানের কণ্ঠ শুধু প্রেম কিংবা বিরহের গানেই সীমাবদ্ধ ছিল না। গজল, লোকগীতি, চলচ্চিত্রের গান থেকে দেশাত্মবোধক গান—বিভিন্ন ধারায় তিনি নিজের স্বাক্ষর রেখেছেন।
১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় তাঁর দেশাত্মবোধক গান পাকিস্তানে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়। রেডিও ও টেলিভিশনে প্রচারিত এসব গানের মাধ্যমে তিনি যুদ্ধকালীন জাতীয় আবেগের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন। ফলে তাঁর কণ্ঠ চলচ্চিত্রের গণ্ডি ছাড়িয়ে একটি বৃহত্তর সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ হয়ে ওঠে।
লতা মঙ্গেশকরের কাছেও ছিলেন অনুপ্রেরণা
ভারত ও পাকিস্তানের সংগীত ইতিহাসে নূরজাহান ও লতা মঙ্গেশকরের নাম বহুবার