নায়ক হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে মুম্বাইয়ে এসেছিলেন মুস্তাক খান। কিন্তু তখন তাঁর কোনো বড় পরিচয় ছিল না, ছিল না চলচ্চিত্রজগতের শক্তিশালী যোগাযোগও। এমনকি নিজের বাড়িতে একটি টেলিফোন পর্যন্ত ছিল না। কোনো পরিচালক বা প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ফোন করলে সেই খবর পেতে পাশের মুদিদোকানিকে এক টাকা করে দিতে হতো। প্রতিদিন কাজ শেষে সন্ধ্যায় দোকানে গিয়ে জানতে চাইতেন—তাঁর জন্য কেউ ফোন করেছে কি না।

প্রায় দুই সপ্তাহ এভাবেই কেটে যায়। অবশেষে একদিন কাঙ্ক্ষিত ফোনটি আসে। ফোন করেছিলেন পরিচালক মহেশ ভাট। সেই ফোনই বদলে দেয় মুস্তাক খানের অভিনয়জীবনের গতিপথ। ১৯৮৮ সালের ‘কবজা’ সিনেমায় অভিনয়ের সুযোগ পান তিনি। এরপর ‘আশিকি’, ‘দিল হ্যায় কি মানতা নেহি’, ‘সড়ক’, ‘হাম হ্যায় রাহি প্যায়ার কে’সহ একের পর এক ছবিতে দেখা যায় তাঁকে।

তিন দশকের বেশি সময়ের অভিনয়জীবনে নায়ক হওয়া হয়নি তাঁর। তবে বলিউডের পরিচিত পার্শ্ব অভিনেতা হিসেবে নিজের জায়গা তৈরি করেছিলেন মুস্তাক। ‘আশিকি’ থেকে ‘গদার’, ‘হেরা ফেরি’, ‘জোড়ি নম্বর ওয়ান’, ‘মুঝসে শাদি করোগি’ কিংবা ‘ওয়েলকাম’—বিভিন্ন ঘরানার সিনেমায় নানা চরিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি।

২৪ সেপ্টেম্বর মুম্বাইয়ের নানাবতী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৫৬ বছর বয়সে মারা যান এই অভিনেতা। দীর্ঘদিন ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করছিলেন তিনি। তাঁর চলে যাওয়া তাই শুধু একজন পার্শ্ব অভিনেতার বিদায় নয়; বরং বলিউডে নিজের জায়গা তৈরি করতে দীর্ঘ সংগ্রাম করা এক শিল্পীর পথচলারও সমাপ্তি।

শুরুটা ছিল কঠিন

মধ্যপ্রদেশের বালাঘাট জেলার বাইহার শহরে জন্ম মুস্তাক খানের। অভিনয়ের স্বপ্ন নিয়ে সেখান থেকেই মুম্বাইয়ে পাড়ি জমান তিনি। সেই সময় নতুন একজন অভিনেতার জন্য চলচ্চিত্রে কাজ পাওয়া ছিল বেশ কঠিন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ই-মেইল কিংবা মুঠোফোন—কোনোটিই ছিল না। পরিচিত পরিচালক বা প্রযোজকের কাছে পৌঁছানোই ছিল বড় চ্যালেঞ্জ।

মুস্তাক পরে জানিয়েছিলেন, মহেশ ভাটের সঙ্গে দেখা করার চেষ্টাও করেছিলেন তিনি। তখন ভাট বলিউডে প্রতিষ্ঠিত পরিচালক। তাঁর সঙ্গে কয়েক মিনিট কথা বলার সুযোগ পাওয়াও সহজ ছিল না। তবে চেষ্টা চালিয়ে যান মুস্তাক।

তাঁর এই যাত্রায় সহযোগিতা করেছিলেন চিত্রনাট্যকার সেলিম খান। তাঁর সুপারিশেই মহেশ ভাটের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ পান মুস্তাক। প্রথম সাক্ষাতে অবশ্য কোনো চরিত্র পাননি। ভাট তাঁকে ভাই মুকেশ ভাট ও চিত্রনাট্যকার রবিন ভাটের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন।

এরপর শুরু হয় অপেক্ষা। বাড়িতে টেলিফোন না থাকায় পাশের মুদিদোকানই হয়ে ওঠে তাঁর যোগাযোগের ঠিকানা। কোনো ফোন এলে খবর দেওয়ার জন্য দোকানদারকে প্রতিবার এক টাকা করে দিতেন তিনি। প্রায় ১৫ দিন পর সেই দোকান থেকেই আসে কাঙ্ক্ষিত খবর—মুস্তাকের জন্য ফোন এসেছে।

‘কবজা’ দিয়ে শুরু, এরপর মহেশ ভাটের ছবিতে নিয়মিত

১৯৮৮ সালে মহেশ ভাটের ‘কবজা’ সিনেমায় অভিনয়ের সুযোগ পান মুস্তাক খান। রাজ বব্বর, সঞ্জয় দত্ত, ডিম্পল কাপাডিয়া ও অমৃতা সিং অভিনীত ছবিটিতে তিওয়ারি চরিত্রে দেখা যায় তাঁকে। চরিত্রটি খুব বড় না হলেও তাঁর অভিনয় পরিচালকের নজর কাড়ে।

একটি দৃশ্যে তাঁর অভিনয়ে সন্তুষ্ট হয়ে মহেশ ভাট পরে ‘স্বয়ম’ নামের একটি টেলিফিল্মে তাঁকে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে সুযোগ দেন। সেখানে ওয়াহিদা রহমান ও আকর্ষ খুরানার মতো শিল্পীরাও অভিনয় করেছিলেন।

এরপর মহেশ ভাটের একাধিক ছবিতে পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন মুস্তাক। ‘আশিকি’, ‘দিল হ্যায় কি মানতা নেহি’, ‘সাথী’, ‘সড়ক’, ‘জুনুন’, ‘গুনাহ’, ‘সির’, ‘হাম হ্যায় রাহি প্যায়ার কে’, ‘গুমরাহ’, ‘নারাজ’ ও ‘চাহত’-এর মতো সিনেমায় অভিনয় করেন তিনি।

১৯৯৩ সালের ‘হাম হ্যায় রাহি প্যায়ার কে’তে ভগবতী প্রসাদ মিশ্র চরিত্রে অভিনয় করে আরও বেশি পরিচিতি পান মুস্তাক। এরপর নব্বইয়ের দশক থেকে দুই হাজারের শুরুর দিকে একের পর এক জনপ্রিয় ছবিতে দেখা যায় তাঁকে।

‘গদার’-এর গুল্লু, ‘ওয়েলকাম’-এর বাল্লু

২০০১ সালের ‘গদার: এক প্রেম কথা’ মুস্তাক খানের ক্যারিয়ারের উল্লেখযোগ্য সিনেমাগুলোর একটি। সানি দেওলের সঙ্গে অভিনয় করা ছবিটিতে তাঁর চরিত্রের নাম ছিল গুল খান, যাকে গুল্লু নামেও ডাকা হতো। দুই দশকের বেশি সময় পর ‘গদার ২’-তেও একই চরিত্রে ফিরেছিলেন তিনি।

তবে সাধারণ দর্শকের কাছে মুস্তাকের সবচেয়ে পরিচিত চরিত্রগুলোর একটি ‘ওয়েলকাম’-এর বাল্লু। ২০০৭ সালের এই ছবিতে অক্ষয় কুমার, ক্যাটরিনা কাইফ, নানা পাটেকর, অনিল কাপুর ও পরেশ রাওয়ালের মতো তারকার সঙ্গে অভিনয় করেন তিনি।

তাঁর চরিত্রটি ছিল তুলনামূলক ছোট। কিন্তু প্রতিবন্ধী সাবেক হকি খেলোয়াড় বাল্লুর স্বতন্ত্র হাঁটা, শরীরী ভাষা ও কমেডির সময়জ্ঞান চরিত্রটিকে দর্শকের মনে আলাদা জায়গা করে দেয়।

পরে জানা যায়, এই জনপ্রিয় চরিত্রটির জন্য মুস্তাক পারিশ্রমিক পেয়েছিলেন মাত্র ১ লাখ রুপি। তিনি নিজেই জানিয়েছিলেন, অতিরিক্ত কয়েক দিন শুটিং করেও প্রত্যাশার তুলনায় কম পারিশ্রমিক পেয়েছিলেন। তাঁর দাবি ছিল, ছবির প্রধান অভিনেতা অক্ষয় কুমারের স্টাফদের কেউ কেউ তাঁর চেয়েও বেশি পারিশ্রমিক পেয়েছিলেন।

তবে পারিশ্রমিকের অঙ্ক তাঁর চরিত্রের জনপ্রিয়তাকে ছাপিয়ে যেতে পারেনি। দর্শকের মনে বাল্লু চরিত্রে মুস্তাকের অভিনয় থেকে যায়।

কমেডির বাইরেও ছিল দীর্ঘ অভিনয়জীবন

মুস্তাক খানকে অনেকেই কমেডি অভিনেতা হিসেবে মনে রাখেন। তবে তাঁর অভিনয় শুধু হাসির চরিত্রে সীমাবদ্ধ ছিল না। পুলিশ, প্রতিবেশী, আত্মীয়, কেরানি কিংবা পরিবারের সদস্য—বিভিন্ন ধরনের পার্শ্বচরিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি।

‘বালা’, ‘বধাই দো’, ‘স্ত্রী ২’-এর মতো তুলনামূলক সাম্প্রতিক সিনেমাতেও কাজ করেছেন মুস্তাক। টেলিভিশনেও ছিল তাঁর নিয়মিত উপস্থিতি। ‘কুছ রং পেয়ার কে অ্যায়সে ভি’সহ বিভিন্ন ধারাবাহিকে অভিনয় করেছেন তিনি।

তাই তিন দশকের বেশি সময় পরও তাঁর মুখ দর্শকের কাছে অপরিচিত হয়ে ওঠেনি। সিনেমায় কয়েক মিনিটের জন্য পর্দায় এলেও তাঁর উপস্থিতি দর্শকের নজর কেড়ে নিত।

জীবনের শেষ দিকে অপহরণের শিকার

অভিনয়জীবনের শেষ দিকেও কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছিল মুস্তাককে। ২০২৪ সালের নভেম্বরে একটি অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার কথা বলে তাঁকে উত্তর প্রদেশে ডেকে নেওয়া হয়। পরে তিনি অপহৃত হন।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০ নভেম্বর তাঁকে দিল্লি থেকে বিজনোরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে একটি বাড়িতে আটকে রেখে মুক্তিপণ দাবি করা হয়েছিল। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় ২ লাখ ২০ হাজার রুপি মুক্তিপণ চাওয়া হয়েছিল। তাঁকে নির্যাতনও করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে।

পরদিন সুযোগ বুঝে সেখান থেকে পালিয়ে কাছের একটি মসজিদে আশ্রয় নেন মুস্তাক। পরে নিজের অভিজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেছিলেন, অপহরণকারীরা ঘুমিয়ে পড়ার সুযোগে বেরিয়ে আসেন এবং আজানের শব্দ শুনে মসজিদের দিকে যান।

পরে উত্তর প্রদেশ পুলিশ জানায়, একই চক্র অন্য অভিনেতাদেরও টার্গেট করেছিল। শক্তি কাপুরকেও একই ধরনের অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানিয়ে অপহরণের পরিকল্পনা করা হয়েছিল বলে পুলিশ জানিয়েছিল।

শেষ লড়াই ক্যানসারের সঙ্গে

অপহরণের সেই অভিজ্ঞতা পেরিয়ে আবারও অভিনয়ে ফিরেছিলেন মুস্তাক। তবে জীবনের শেষ সময়ে তাঁকে লড়তে হয়েছে ক্যানসারের সঙ্গে।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কয়েক বছর আগে তাঁর ক্যানসার ধরা পড়ে। চিকিৎসার পর তিনি সুস্থও হয়েছিলেন। পরে আবার রোগটি ফিরে আসে। সম্প্রতি শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে মুম্বাইয়ের নানাবতী হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

২৪ সেপ্টেম্বর সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান এই অভিনেতা। তাঁর মৃত্যুতে দীর্ঘ অভিনয়জীবনের একটি অধ্যায়েরও সমাপ্তি হলো।

নায়ক হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে মুম্বাইয়ে আসা সেই তরুণ শেষ পর্যন্ত নায়ক হতে পারেননি। কিন্তু তিন দশকের বেশি সময় ধরে অসংখ্য সিনেমায় ছোট-বড় চরিত্রে অভিনয় করে দর্শকের মনে নিজের একটি জায়গা তৈরি করেছিলেন। ‘আশিকি’র সময়ের তরুণ অভিনেতা, ‘গদার’-এর গুল্লু, ‘হাম হ্যায় রাহি প্যায়ার কে’র ভগবতী প্রসাদ কিংবা ‘ওয়েলকাম’-এর বাল্লু—প্রতিটি চরিত্রই তাঁর দীর্ঘ অভিনয়যাত্রার আলাদা স্মৃতি হয়ে রয়ে গেল।