কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের গোপন বৈঠক, ঝটিকা মিছিল ও নাশকতার অভিযোগ ঘিরে সাম্প্রতিক সময়ে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। এর মধ্যেই পুলিশের ভেতরে কোনো সদস্য রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত হয়ে দায়িত্বে অবহেলা করছেন কি না, কিংবা নিষিদ্ধ দলের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন কি না—সেটিও খতিয়ে দেখছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

সাম্প্রতিক এই আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে ঢাকা মহানগর পুলিশের ক্যান্টনমেন্ট থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. রাকিবুল হাসানের একটি অডিও। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর তাঁকে ক্যান্টনমেন্ট থানা থেকে প্রত্যাহার করে ডিএমপি সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়। পরে তাঁর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা করা হয় এবং ২৪ সেপ্টেম্বর আদালত তাঁকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নেওয়ার অনুমতি দেন।

অডিওতে রাকিবুলকে পুলিশের সক্ষমতা, মাঠপর্যায়ের সদস্যদের অবস্থান এবং শেখ হাসিনার সম্ভাব্য দেশে ফেরার বিষয়ে কথা বলতে শোনা যায় বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। তবে অডিওতে করা বিভিন্ন দাবির সত্যতা এবং কথোপকথনের পূর্ণ প্রেক্ষাপট তদন্তের বিষয়। রাকিবুলের বিরুদ্ধে করা মামলার অভিযোগও এখনো আদালতে প্রমাণিত হয়নি।

এর মধ্যেই রোববার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের বলেন, সাবেক ওসি রাকিবুল হাসানের সঙ্গে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। তবে এই সংশ্লিষ্টতার ধরন ও পরিধি কী, তা তদন্তের মাধ্যমে আরও স্পষ্ট হওয়ার বিষয়।

এদিকে রাজধানীর গুলিস্তানে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে শনিবার পুলিশের অভিযানও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। পুলিশ সেখানে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের গোপন বৈঠকের তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছে। অভিযানে ২৭৮ জনকে আটক করা হয়। রোববার পর্যন্ত তাঁদের মধ্যে ২৪৯ জনকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে এবং বাকি ২৯ জনের পরিচয় যাচাই-বাছাই চলছিল বলে ডিএমপি জানিয়েছে।

তবে জাসদের পক্ষ থেকে পুলিশের অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে। দলটির দাবি, তাদের কেন্দ্রীয় প্রতিনিধি সভা চলছিল এবং সভার বিষয়ে পুলিশকে আগে থেকেই জানানো হয়েছিল। ফলে গুলিস্তানের ঘটনাতেও পুলিশের অভিযোগ ও রাজনৈতিক দলের বক্তব্যের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।

এর আগে গত কয়েক মাসে রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নামে ঝটিকা মিছিল এবং সংঘর্ষ বা ককটেল বিস্ফোরণের মতো ঘটনার খবর এসেছে। এসব ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গোয়েন্দা সক্ষমতা, আগাম তথ্য সংগ্রহ এবং মাঠপর্যায়ের দায়িত্ব পালনের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির পাশাপাশি পুলিশের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা নিয়েও এখন নজরদারি বাড়ানো হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা গেছে। বিশেষ করে কোনো পুলিশ সদস্য নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন কি না, দায়িত্ব পালনে পক্ষপাত দেখাচ্ছেন কি না কিংবা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়াচ্ছেন কি না—এসব বিষয় যাচাই করা হচ্ছে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।

অন্যদিকে রাজনৈতিক তৎপরতার পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব, বিভ্রান্তিকর তথ্য ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে তৈরি ভুয়া অডিও-ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার বিষয়টিও সরকারের নজরে এসেছে। এসব বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাইবার সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা চলছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মোকাবিলায় পুলিশের পেশাদারিত্ব, নিরপেক্ষতা এবং চেইন অব কমান্ড বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ। তবে পুলিশের ভেতরে কোনো সদস্যের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা বা নিষিদ্ধ দলের সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগ উঠলে সেটি প্রমাণের জন্য নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।

এদিকে রাকিবুল হাসানের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলার তদন্ত এবং রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ থেকে পুলিশের ভেতরের তাঁর কথিত যোগাযোগ বা সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে আরও তথ্য সামনে আসতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। একই সঙ্গে তদন্তে অভিযোগের সত্যতা না মিললে সে বিষয়টিও পরিষ্কার হবে।

ফলে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতে একদিকে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের মাঠপর্যায়ের তৎপরতা, অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা—দুই বিষয়ই সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।