প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের পূর্বেই বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান অঙ্গীকার করেছিলেন—সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ কিংবা দুর্নীতিবাজদের দলীয় পরিচয় যাই হোক না কেন, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নিজের দলের সংসদ সদস্যকে তাৎক্ষণিক পদত্যাগের নির্দেশ দিয়ে তিনি প্রমাণ করেছেন অপরাধীদের ক্ষেত্রে তাঁর ‘শূন্য সহিষ্ণুতা’ নীতি কেবল মুখের কথা নয়, বরং বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ।

বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে এটি এক নজিরবিহীন ঘটনা। অতীতে ফেনীর জয়নাল হাজারী কিংবা ইয়াবা কারবারে অভিযুক্ত বদির মতো বহুল চর্চিত ব্যক্তিরা দিব্যি সংসদ সদস্য পদে বহাল থেকেছেন। অতীত সরকারগুলোর আমলে সরকারি দলের ছত্রছায়ায় পাতি নেতা থেকে শুরু করে কর্মীরা পর্যন্ত অপরাধে জড়িয়ে পড়লেও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো নিরুপায় ছিল। মূলত, ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের যেন অন্যায়-অপকর্মের একছত্র লাইসেন্স দেওয়া হতো।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও অনৈতিক ধারার অবসান দীর্ঘ ১৭ বছর পর গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফিরে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান এই অনৈতিক রাজনীতি পরিবর্তনের ঘোষণা দেন। তিনি স্পষ্ট জানান, অপরাধীর একটাই পরিচয়—সে অপরাধী। এই নীতির অংশ হিসেবেই মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় নাম আসায় সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকে বুধবার রাতে পদত্যাগের নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান। দ্রুততম সময়ে পদত্যাগ না করলে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থার বার্তা দেওয়া হয়।

অতীতে নিজের দলের লোকের অন্যায় ঢাকতে রাজনৈতিক ‘অস্বীকৃতির সংস্কৃতি’ চালু ছিল। ধারণাকে প্রাধান্য দেওয়া হতো যে নিজের দলের কারও অপরাধ স্বীকার করলে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয়। অথচ এতে সামগ্রিকভাবে রাজনীতির ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস নষ্ট হতো। অতীতে কোনো শীর্ষ নেতা নিজের দলে এমন সাহসের সঙ্গে শুদ্ধি অভিযান চালানোর দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারেননি।

দলের শৃঙ্খলা ও আপসহীন অবস্থান বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান থাকার সময় থেকেই কঠিন রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে তারেক রহমান দলীয় শৃঙ্খলার প্রশ্নে কোনো আপস করেননি। ২০১৮ সালের নির্বাচনের পর সিদ্ধান্ত অমান্য করে যারা স্থানীয় সরকার নির্বাচনে গিয়েছিলেন, তাঁদের আজীবনের জন্য বহিষ্কার করা হয়।

এমনকি ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কিছু বিপথগামী নেতাকর্মী অনিয়মে জড়াতে চাইলে গত দুই বছরে সহস্রাধিক নেতাকে দল থেকে সরাসরি বহিষ্কার করা হয়। এবার সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে এই কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ বিএনপিকে একটি পরিচ্ছন্ন ও স্বচ্ছ দল হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ।

রাজনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ও কঠোর সতর্কবার্তা সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে নেওয়া এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে যে, সরকার যেকোনো অপকর্মের বিরুদ্ধে কঠোরতম অবস্থানে রয়েছে। অপরাধ করে আর পার পাওয়ার সুযোগ নেই।

তারেক রহমানের এই সাহসী ও নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত শুধু বিএনপিকেই পরিচ্ছন্ন করবে না, বরং অন্যান্য রাজনৈতিক দলকেও তাদের ভেতরের অনিয়ম দূর করার সাহস জোগাবে। যা ভবিষ্যতে বাংলাদেশকে দুর্নীতি, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজিমুক্ত রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।