একটি খুন, এক দম্পতি আর দুজনের দুই রকম বয়ান—কোনটি সত্য, আর কোনটি মিথ্যা? রহস্যের উত্তর খুঁজতে যত এগোনো যায়, ততই বদলে যেতে থাকে চরিত্রগুলো সম্পর্কে ধারণা। এমন গল্প নিয়েই নেটফ্লিক্সে মুক্তি পেয়েছিল রহস্য-থ্রিলার সিরিজ ‘হিজ অ্যান্ড হার্স’। মুক্তির কয়েক মাস পর নেটফ্লিক্সের হিসাব বলছে, দর্শকদের মধ্যে সিরিজটি বেশ সাড়া ফেলেছে।
নেটফ্লিক্সের ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসের হিসাবে, বছরের প্রথমার্ধে সবচেয়ে বেশি দেখা সিরিজ হয়েছে ‘হিজ অ্যান্ড হার্স’। জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত সিরিজটির ভিউ হয়েছে ১০ কোটি ৪ লাখ। একই সময়ে নেটফ্লিক্সের সব ধরনের কনটেন্ট মিলিয়ে মোট দেখা হয়েছে ৯৭ বিলিয়নের বেশি ঘণ্টা।
ছয় পর্বের সিরিজটি মুক্তি পায় ৮ জানুয়ারি। অ্যালিস ফিনির ২০২০ সালের একই নামের উপন্যাস অবলম্বনে এটি নির্মাণ করেছেন উইলিয়াম ওল্ডরয়েড। ‘লেডি ম্যাকবেথ’ ও ‘ইলিন’-এর মতো সিনেমার জন্য পরিচিত এই নির্মাতা সিরিজটিতে প্রধান চরিত্রে এনেছেন টেসা থম্পসন ও জন বার্নথালকে। নির্বাহী প্রযোজকদের একজন জেসিকা চ্যাস্টেইন।
খুনের তদন্তে মুখোমুখি স্বামী-স্ত্রী
গল্পের কেন্দ্রে আনা অ্যান্ড্রুজ ও জ্যাক হার্পার। আনা আটলান্টার একটি টেলিভিশন চ্যানেলের সংবাদ উপস্থাপক। ব্যক্তিগত ও পেশাগত নানা টানাপোড়েনে অনেকটা আড়ালে চলে যাওয়ার পর নিজের বেড়ে ওঠার শহর ডালোনেগায় একটি হত্যাকাণ্ডের খবর পান তিনি।
ঘটনাটি আনার পুরোনো সাংবাদিক সত্তাকে আবার জাগিয়ে তোলে। হত্যাকাণ্ডের রহস্য অনুসন্ধানে নামেন তিনি। কিন্তু তদন্তের দায়িত্বে থাকা গোয়েন্দা জ্যাক হার্পার তাঁর বিচ্ছিন্ন স্বামী হওয়ায় বিষয়টি দ্রুত জটিল হয়ে ওঠে।
একই হত্যাকাণ্ডকে ঘিরে আনা ও জ্যাকের অনুসন্ধান যেন দুটি আলাদা গল্প তৈরি করে। একজন সাংবাদিক হিসেবে সত্যের সন্ধান করছেন, অন্যজন গোয়েন্দা হিসেবে খুঁজছেন খুনিকে। কিন্তু তদন্ত যত এগোয়, সন্দেহের তালিকায় ততই উঠে আসে তাঁদের দুজনের নাম।
নেটফ্লিক্সের তথ্য অনুযায়ী, আনা ও জ্যাক দুজনেই বিশ্বাস করেন অন্যজন হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত হতে পারেন। ফলে সিরিজটি শুধু একটি খুনের রহস্য নয়; একই সঙ্গে ভেঙে যাওয়া একটি দাম্পত্য সম্পর্কের অজানা অধ্যায়ও সামনে আনে।
দুই চরিত্রে টেসা ও জন
সিরিজটির অন্যতম আকর্ষণ টেসা থম্পসন ও জন বার্নথালের অভিনয়। ‘ক্রিড’, ‘থর’ ও ‘ওয়েস্টওয়ার্ল্ড’-এর মতো কাজের জন্য পরিচিত টেসা এখানে আনা চরিত্রে অভিনয় করেছেন। অন্যদিকে ‘দ্য পানিশার’ ও ‘দ্য বেয়ার’-এর মতো সিরিজে অভিনয় করা জন বার্নথালকে দেখা গেছে জ্যাকের ভূমিকায়।
আনা উচ্চাভিলাষী, বুদ্ধিমান ও দৃঢ়চেতা একজন সাংবাদিক। নিজের পেশাগত অবস্থান ফিরে পাওয়ার চেষ্টা যেমন আছে, তেমনি পুরোনো শহরের হত্যাকাণ্ড তাঁকে ব্যক্তিগতভাবেও নাড়া দেয়। টেসা থম্পসন চরিত্রটির দৃঢ়তার পাশাপাশি তার ভেতরের দ্বন্দ্বও তুলে ধরেছেন।
অন্যদিকে জ্যাকের চরিত্রও শুধু একজন তদন্তকারী কর্মকর্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। হত্যাকাণ্ডের তদন্তের পাশাপাশি তাঁকে নিজের অতীত, দাম্পত্য সম্পর্ক ও নেওয়া সিদ্ধান্তগুলোর মুখোমুখি হতে হয়। ফলে আনা ও জ্যাকের সম্পর্কই ধীরে ধীরে রহস্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে।
রটেন টমেটোজের সমালোচকদের সারাংশেও দুই অভিনেতার অভিনয়কে সিরিজটির উল্লেখযোগ্য শক্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। যদিও গল্পের রহস্যের সমাধান নিয়ে সমালোচকদের একাংশের সন্তুষ্টি ছিল সীমিত।
খুনের আড়ালে সম্পর্কের গল্প
‘হিজ অ্যান্ড হার্স’-এ হত্যাকাণ্ডের পাশাপাশি গুরুত্ব পেয়েছে বিশ্বাসভঙ্গ, পুরোনো সম্পর্ক, প্রতিশোধ ও পারিবারিক গোপনীয়তা। আনা ও জ্যাকের দাম্পত্য কেন ভেঙে গেল, তাঁদের সম্পর্কের ভেতরে কী ঘটেছিল—এসব প্রশ্নও একপর্যায়ে হত্যারহস্যের সঙ্গে জড়িয়ে যায়।
তাঁদের আশপাশের চরিত্রগুলোরও রয়েছে নানা গোপন তথ্য। আনার মা অ্যালিস, জ্যাকের বোন জো, টেলিভিশনকর্মী রিচার্ড ও লেক্সিসহ অন্য চরিত্রগুলো তদন্তকে বারবার নতুন দিকে নিয়ে যায়। ফলে দর্শকের অনুমানও একাধিকবার বদলে যায়।
সিরিজটির অন্যান্য চরিত্রে অভিনয় করেছেন পাবলো শ্রেইবার, ক্রিস্টাল ফক্স, সুনীতা মণি, রেবেকা রিটেনহাউস ও মেরিন আয়ারল্যান্ড।
দর্শক কেন দেখছেন
সিরিজটির গল্পের কেন্দ্রীয় প্রশ্ন খুবই সরল—খুনি কে? তবে প্রতিটি পর্বে নতুন তথ্য যোগ হওয়া এবং আগের ঘটনাগুলোর ভিন্ন ব্যাখ্যা সামনে আসার কারণে রহস্য আরও ঘনীভূত হয়। ছয় পর্বের সীমিত দৈর্ঘ্যও গল্পটিকে দীর্ঘ না করে দ্রুত এগিয়ে নিতে সাহায্য করেছে।
দ্য গার্ডিয়ান সিরিজটিকে দ্রুতগতির ও সহজে একের পর এক পর্ব দেখার মতো থ্রিলার হিসেবে উল্লেখ করেছে। আর নেটফ্লিক্সের নিজস্ব হিসাবও দেখাচ্ছে দর্শকের আগ্রহের পরিমাণ। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে ১০ কোটি ৪ লাখ ভিউ নিয়ে ‘হিজ অ্যান্ড হার্স’ ছিল প্ল্যাটফর্মটির সবচেয়ে বেশি দেখা সিরিজ। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা ‘ব্রিজারটন’ চতুর্থ মৌসুমের ভিউ ছিল ১০ কোটি ২ লাখ।
সমালোচকদের প্রতিক্রিয়া মিশ্র
দর্শকের আগ্রহের সঙ্গে সমালোচকদের প্রতিক্রিয়া অবশ্য পুরোপুরি এক হয়নি। রটেন টমেটোজে ৫২টি সমালোচনার ভিত্তিতে সিরিজটির সমালোচক স্কোর ৭১ শতাংশ এবং দর্শক স্কোর ৬২ শতাংশ। মেটাক্রিটিকে ২১ জন সমালোচকের পর্যালোচনার ভিত্তিতে সিরিজটির স্কোর ৫৪/১০০, যা ‘মিশ্র বা গড়পড়তা’ প্রতিক্রিয়া নির্দেশ করে।
কিছু সমালোচক টেসা থম্পসন ও জন বার্নথালের অভিনয় এবং সিরিজের গতি প্রশংসা করেছেন। অন্যদিকে হলিউড রিপোর্টার ও রজারএবার্ট ডটকমের পর্যালোচনায় গল্পের কিছু যুক্তি, অতিরিক্ত মোড় এবং চরিত্রগুলোর সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
দ্য গার্ডিয়ানের মূল্যায়ন ছিল তুলনামূলক ইতিবাচক। তাদের কাছে সিরিজটি দ্রুতগতির ও বিনোদনধর্মী একটি থ্রিলার। অর্থাৎ সমালোচকদের আপত্তির জায়গা মূলত গল্পের যুক্তি ও গভীরতা নিয়ে, তবে দর্শককে পরের পর্বে নিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা নিয়ে সিরিজটি যথেষ্ট আলোচনায় এসেছে।
সব মিলিয়ে ‘হিজ অ্যান্ড হার্স’ নতুন কোনো রহস্য-থ্রিলার সূত্র তৈরি করেনি। খুন, সন্দেহভাজন, গোপন সম্পর্ক ও শেষ মুহূর্তের মোড়—সবই পরিচিত উপাদান। তবে ছয় পর্বে এসব উপাদানকে এমনভাবে সাজানো হয়েছে, যাতে দর্শকের সামনে বারবার ফিরে আসে একই প্রশ্ন—আসলে সত্যিটা কী?
আনা ও জ্যাকের গল্পে একই ঘটনার দুই ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি দেখানো হয়েছে। আর এই দ্বৈত দৃষ্টিভঙ্গিই ‘হিজ অ্যান্ড হার্স’-কে শুধু একটি হত্যারহস্যের গল্প না রেখে সম্পর্ক, অবিশ্বাস ও ব্যক্তিগত সত্যের গল্পেও পরিণত করেছে।