২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে চলে যান সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনের অবসানের পর থেকে ভারতেই অবস্থান করছেন তিনি। এরই মধ্যে আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা। তার এই ঘোষণাকে ঘিরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে রাজনৈতিক অঙ্গনে।

শেখ হাসিনা সত্যিই দেশে ফিরবেন, নাকি তার এই ঘোষণা দলীয় নেতাকর্মীদের চাঙা রাখা ও রাজনৈতিক চাপ তৈরির কৌশল—তা নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ডিসেম্বরের মধ্যে তার দেশে ফেরা কিংবা না ফেরা—দুই পরিস্থিতিই বাংলাদেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।

বর্তমান রাজনৈতিক ও আইনি বাস্তবতায় শেখ হাসিনার দেশে ফেরার পথ সহজ নয়। দেশে ফিরলে তাকে একাধিক আইনি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হতে পারে। অন্যদিকে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দেশে ফিরতে না পারলে তার নেতৃত্বের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে শেখ হাসিনা দেশে ফিরতে না পারলে নতুন বছরের শুরু থেকেই তার নেতৃত্ব নিয়ে সংকট তৈরি হতে পারে। ভবিষ্যতে দেশে ফেরার বিষয়ে তার যেকোনো নতুন ঘোষণা নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের কাছে আগের মতো বিশ্বাসযোগ্যতা পাবে কি না, তা নিয়েও সংশয় রয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ আইনুল ইসলাম মনে করেন, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বক্তব্য মূলত দলীয় নেতাকর্মীদের সক্রিয় রাখার রাজনৈতিক কৌশল। তার ভাষ্য, দেশে ফিরলে শেখ হাসিনাকে আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হবে। বর্তমান বয়স ও পরিস্থিতিতে তিনি সেই আইনি লড়াই এবং দেশের সামগ্রিক বাস্তবতা মোকাবিলা করবেন কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। এ কারণে তার দেশে ফেরার বক্তব্যকে রাজনৈতিক স্লোগান হিসেবেই দেখছেন এই শিক্ষক।

অধ্যাপক আইনুল ইসলাম আরও বলেন, ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফিরতে না পারলে শেখ হাসিনা ভ্রমণসংক্রান্ত কাগজপত্র বা বিমান অবতরণের অনুমতির মতো বিষয় সামনে আনতে পারেন। তবে এসব ব্যাখ্যা তার রাজনৈতিক অবস্থানের যে ঘাটতি তৈরি হবে, তা পূরণ করতে পারবে না বলে মনে করেন তিনি।

রাজনীতি বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজের মতে, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বিষয়টি এখনো অনিশ্চিত। এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, এমনটা মনে করার যথেষ্ট কারণ নেই। দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত মূলত শেখ হাসিনার নিজের ওপর নির্ভর করছে।

আলতাফ পারভেজ বলেন, শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তেজনা তৈরি হতে পারে। তাকে ঘিরে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন করে সক্রিয়তা দেখা দিতে পারে। একই সঙ্গে তার বিরুদ্ধে থাকা মামলার রায় ও সেগুলোর বাস্তবায়ন নিয়ে রাজনৈতিক আলোচনা আরও জোরালো হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

অন্যদিকে, রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ক্ষেত্রে বর্তমান আইনি পরিস্থিতি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। ইতোমধ্যে একটি মামলায় তার মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়েছে। পাশাপাশি আওয়ামী লীগের কার্যক্রমও নিষিদ্ধ রয়েছে। ফলে দেশে ফিরলে তাকে এসব আইনি ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে।

এ ছাড়া শেখ হাসিনার দেশে ফেরার প্রশ্নে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পক্ষের রাজনৈতিক শক্তিগুলোর অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। সরকার ও বিরোধী দলগুলোর মধ্যে বিভিন্ন ইস্যুতে মতপার্থক্য থাকলেও শেখ হাসিনার প্রশ্নে তাদের অবস্থান নতুন রাজনৈতিক মেরুকরণ তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা।

শেখ হাসিনার দেশে ফেরার কোনো নৈতিক অবস্থান নেই বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল। যুগান্তরকে তিনি বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর প্রাণহানির ঘটনায় শেখ হাসিনার প্রথম দায়িত্ব ছিল মানুষের কাছে দুঃখ প্রকাশ ও অনুশোচনা জানানো। কিন্তু তার বক্তব্যে এখনো বলপ্রয়োগ ও জেদের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে বলে মনে করেন তিনি।

আলাল আরও বলেন, শেখ হাসিনা নিজেই তার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার হিসেবে শেখ সেলিমের নাম উল্লেখ করেছেন। শেখ সেলিমের সাহস থাকলে তার দেশে ফিরে আসা উচিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধের বিষয়টি প্রসঙ্গে আলাল বলেন, এ নিষেধাজ্ঞার গেজেট চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট করা হয়েছে। বিষয়টি বর্তমানে বিচার বিভাগের এখতিয়ারাধীন হওয়ায় এ মুহূর্তে এ নিয়ে মন্তব্য করা কঠিন।

অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামিম বলেন, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বাংলাদেশে একাধিক মামলা বিচারাধীন রয়েছে এবং ট্রাইব্যুনালের একটি মামলায় তিনি দণ্ডিত হয়েছেন। ভারতকে প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় তাকে গ্রেপ্তার করে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর আহ্বান জানান তিনি।

প্রসিকিউটর তামিমের দাবি, শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে বিমানবন্দরেই তাকে গ্রেপ্তার করা হবে। এ ছাড়া ট্রাইব্যুনালের আইনে রায়ের কপি পাওয়ার ৩০ দিন পর আপিলের সুযোগ থাকে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, মৃত্যুদণ্ডের রায়ের বিরুদ্ধে শেখ হাসিনার আপিল করার সময়সীমা ইতোমধ্যে পেরিয়ে গেছে।

সব মিলিয়ে শেখ হাসিনার ডিসেম্বরের দেশে ফেরার ঘোষণা ঘিরে রাজনৈতিক আলোচনা ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। তবে এই ঘোষণা বাস্তবে রূপ নেবে, নাকি রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবেই থেকে যাবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত, চলমান আইনি পরিস্থিতি এবং দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতাই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে তার দেশে ফেরার সম্ভাবনা ও এর প্রভাব।