দেশে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) সংকট নেই বলে দাবি করছেন আমদানিকারক ও অপারেটররা। তাদের ভাষ্য, পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে এবং আমদানিও অব্যাহত আছে। তবে বাজারে এর ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে। রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) নির্ধারিত দামের চেয়ে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডার। কোথাও দাম উঠেছে ২ হাজার ১০০ টাকা পর্যন্ত।
চলতি সেপ্টেম্বর মাসে ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৫৮৫ টাকা নির্ধারণ করেছে বিইআরসি। গত ২ সেপ্টেম্বর আগের মাসের তুলনায় দাম ১৩ টাকা কমানো হলেও নির্ধারিত দামে সিলিন্ডার পাচ্ছেন না অনেক গ্রাহক।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, গত আগস্টে দেশে ১ লাখ ৫৭ হাজার ৭৬০ টন এলপিজি আমদানি হয়েছে। চলতি সেপ্টেম্বরের ২২ তারিখ পর্যন্ত আমদানি হয়েছে আরও ১ লাখ ১৮ হাজার ৭৪২ টন।
এলপিজি ব্যবসায়ীরা সরকারকে জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ ও পরিবহন পরিস্থিতিতে চাপ থাকলেও দেশে বড় ধরনের সংকট নেই। তবে কয়েকজন আমদানিকারকের দাবি, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে এলপিজি কার্গো সংগ্রহ কঠিন হয়ে পড়েছে। হরমুজ প্রণালি ও লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি এবং ভাড়া—দুটিই বেড়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে দুই আমদানিকারক জানান, দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি থাকা সত্ত্বেও কোনো কোনো সরবরাহকারী চুক্তির পরিমাণের তুলনায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কম পণ্য দিচ্ছে। খোলাবাজার থেকেও প্রয়োজন অনুযায়ী কার্গো পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে কিছু প্রতিষ্ঠান সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে রেশনিং করছে।
এদিকে এলপিজির দাম নির্ধারণের সময় বিইআরসি টনপ্রতি ১৬০ ডলার প্রিমিয়াম ধরে হিসাব করেছিল। বর্তমানে সেই প্রিমিয়াম বেড়ে ২৬০ থেকে ৪০০ ডলারে উঠেছে। বাড়তি ব্যয় সমন্বয় করতে না পারায় কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান আমদানি কমিয়েছে বলেও জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
একটি এলপিজি কোম্পানির প্রধান বিপণন কর্মকর্তা বলেন, বর্তমানে সবচেয়ে বড় সমস্যা কার্গো সংগ্রহ। গুরুত্বপূর্ণ দুটি নৌপথে একই সময়ে জটিলতা তৈরি হওয়ায় পর্যাপ্ত কার্গো পাওয়া যাচ্ছে না। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর কেউ কেউ চুক্তির পুরো পরিমাণ পণ্যও পাচ্ছে না।
অন্য একটি কোম্পানির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জানান, সেপ্টেম্বরে তাদের প্রায় ৩০ হাজার টন এলপিজি আমদানি হয়েছে, যা আগের মাসের তুলনায় কম। উৎপাদক পর্যায়ে সরবরাহে অনিশ্চয়তার কারণে বাজারে কিছুটা বিঘ্ন ঘটলেও সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে তারা চেষ্টা করছেন।
খুচরা ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, কয়েকটি কোম্পানি চাহিদা অনুযায়ী সিলিন্ডার সরবরাহ করছে না। এতে বাজারে সংকট তৈরি হচ্ছে। তবে কোম্পানিগুলোর দাবি, সরবরাহ কমার সুযোগ নিয়ে কিছু ডিলার, পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতা সিলিন্ডার মজুত করে বাড়তি দামে বিক্রি করছেন।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ১২ কেজির সিলিন্ডার ২ হাজার থেকে ২ হাজার ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ফলে বিইআরসির নির্ধারিত দামের চেয়ে গ্রাহকদের সর্বোচ্চ ৫১৫ টাকা পর্যন্ত বেশি দিতে হচ্ছে। গত বছরের ডিসেম্বরেও আমদানি কমে একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। তখন কোনো কোনো এলাকায় ১২ কেজির সিলিন্ডার ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়েছিল।
দেশে বছরে প্রায় ১৫ থেকে ১৬ লাখ টন এলপিজির চাহিদা রয়েছে। প্রায় এক কোটি গ্রাহক এই জ্বালানি ব্যবহার করেন। মোট ব্যবহারের প্রায় ৮০ শতাংশ যায় গৃহস্থালির রান্নায়। এ ছাড়া পরিবহন ও শিল্পকারখানাতেও এলপিজি ব্যবহৃত হয়। দেশের এলপিজি বাজারের প্রায় ৯৯ শতাংশ সরবরাহ আসে বেসরকারি খাত থেকে।
সোমবার জ্বালানি বিভাগ আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় অপারেটররা জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদকে দেশে এলপিজির সংকট নেই বলে আশ্বস্ত করেন। আমদানির তথ্য তুলে ধরে তারা দেশের জোগান ও মজুত পরিস্থিতি সন্তোষজনক বলেও জানান।
সভায় মন্ত্রী বলেন, পর্যাপ্ত মজুত থাকার পরও গ্রাহক পর্যায়ে যেন সরবরাহ ঘাটতি না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে অসৎ উদ্দেশ্যে কেউ যেন এলপিজি মজুত করে কৃত্রিম সংকট ও জনদুর্ভোগ তৈরি করতে না পারে, সে বিষয়েও সতর্ক থাকার নির্দেশ দেন তিনি।