আগ্নেয়গিরি ছাড়াই টগবগ করে ফুটছে নদী! আমাজনের রহস্যময় 'বয়লিং রিভার' এর আসল সত্য কী?
স্রোত চলছে স্বাভাবিকভাবেই। অথচ সেই পানিই ফুটছে! ভাবুন তো, চারপাশে ঘন জঙ্গল, তার মাঝ দিয়ে স্বাভাবিক গতিতে বয়ে চলেছে একটি নদী। দূর থেকে দেখলে আর দশটা নদীর মতোই মনে হবে। কিন্তু কাছে গেলেই বদলে যাবে পুরো দৃশ্য। পানিতে হাত দেওয়া তো দূরের কথা, কয়েক সেকেন্ডের বেশি এর কাছাকাছি থাকাও হয়ে উঠতে পারে বিপজ্জনক।অবিশ্বাস্য হলেও এমনই এক রহস্যময় নদীর সন্ধান মিলেছে দক্ষিণ আমেরিকার আমাজন জঙ্গলের গভীরে। পেরুর দুর্গম মায়ান্তুয়াকু অঞ্চলে থাকা এই নদীটি বিশ্বজুড়ে পরিচিত ‘বয়লিং রিভার’ নামে। স্থানীয় আশানিনকা জনগোষ্ঠীর কাছে এর পবিত্র নাম ‘শানায়-তিম্পিশকা’।
তাদের কাছে এটি শুধু প্রকৃতির এক বিস্ময় নয়, বরং একটি ওষুধি ও পবিত্র স্থানও। কিন্তু নদীটিকে ঘিরে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো কোনো আগ্নেয়গিরির কাছাকাছি না থেকেও এর পানি এতটা উত্তপ্ত হয় কীভাবে?এই রহস্যের সন্ধানেই ২০১১ সালে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান শুরু করেন পেরুর ভূ-বিজ্ঞানী আন্দ্রেস রুজো। তবে এই আবিষ্কারের পেছনের গল্পটাও কম রোমাঞ্চকর নয়। ছোটবেলায় নিজের দাদুর কাছ থেকে রুজো শুনেছিলেন এমন এক অলৌকিক নদীর গল্প, যার পানি নাকি টগবগ করে ফুটত। সেই গল্প তখন ছিল নিছক লোককথা।কিন্তু বড় হয়ে বিজ্ঞানী হওয়ার পর সেই শৈশবের কৌতূহলই তাকে তাড়িয়ে বেড়াতে থাকে।রুজোর মনে প্রশ্ন জাগে, দাদুর বলা সেই নদী কি সত্যিই পৃথিবীর কোথাও রয়েছে? অনেকেই অবশ্য প্রথমে তাঁর এই অনুসন্ধানকে গুরুত্ব দেননি। কারণ প্রচলিত বৈজ্ঞানিক ধারণা অনুযায়ী, এত উত্তপ্ত পানির নদী সাধারণত কোনো সক্রিয় আগ্নেয়গিরি অথবা শক্তিশালী ভূতাপীয় উৎসের কাছাকাছি থাকার কথা। কিন্তু আমাজনের এই নদী যেন সেই ধারণাকেই বড় চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিল। কারণ নদীটি কোনো আগ্নেয়গিরির কাছাকাছি না থাকা সত্ত্বেও এর পানির তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে ফুটন্ত!তবে এসব প্রশ্নে থেমে যাননি ভূ-বিজ্ঞানী রুজো। দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর অবশেষে আমাজনের গহীনে প্রায় চার মাইল দীর্ঘ এই বিস্ময়কর নদীর সন্ধান পান তিনি। নদীর বিভিন্ন অংশে পানির তাপমাত্রা এতটাই বেশি যে, সরাসরি সংস্পর্শে এলে তীব্রভাবে দগ্ধ হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। রুজোর বর্ণনা অনুযায়ী, অল্প সময়ের জন্য আঙুল পানিতে রাখলেও তা মারাত্মকভাবে পুড়ে যেতে পারে।তবে পুরো নদীজুড়ে একই রকম তাপমাত্রা থাকে বিষয়টি এমন নয়। নদীর সব অংশ সমানভাবে উত্তপ্ত নয়; বরং কিছু নির্দিষ্ট অংশেই পানির তাপমাত্রা অস্বাভাবিক ফুটন্ত পর্যায়ে পৌঁছে যায়। আর এখানেই বিজ্ঞানীদের আগ্রহ আরও গভীর হয়। কারণ রহস্যটা শুধু এই নয় যে নদীর পানি এত গরম কেন, আসল প্রশ্ন হলো এই তাপের উৎস কোথায়?কোনো বড় আগ্নেয়গিরি কাছাকাছি না থাকলে আমাজনের মাটির নিচে এমন কী ভূতাপীয় ব্যবস্থা কাজ করছে, যার কারণে নদীর নির্দিষ্ট অংশের পানি এতটা উত্তপ্ত হয়ে উঠছে?এই রহস্যময় নদীকে ঘিরে নিজের অনুসন্ধান ও শিহরণ জাগানো অভিজ্ঞতা আন্দ্রেস রুজো তুলে ধরেছেন তাঁর বিখ্যাত বই ‘দ্য বয়লিং রিভার অ্যাডভেঞ্চার অ্যান্ড ডিসকভারি’ তে। আমাজন এমনিতেই পৃথিবীর অন্যতম অজানা ও রহস্যময় প্রাকৃতিক অঞ্চল। এর বিশাল জঙ্গলের কতটা এখনো মানুষের সম্পূর্ণ অনুসন্ধানের বাইরে, তারও সঠিক হিসাব নেই। আর সেই অন্ধকার, দুর্গম অরণ্যের গভীরেই লুকিয়ে রয়েছে এমন এক নদী, যেখানে জীবনদায়ী পানি মুহূর্তেই পরিণত হতে পারে ভয়ংকর উত্তপ্ত শক্তিতে। হয়তো এই নদীর রহস্যের উত্তর শুধু তার পানির মধ্যে নেই; হয়তো উত্তর লুকিয়ে আছে আরও গভীরে আমাজনের মাটির নিচে, পৃথিবীর সেই অদৃশ্য ভূতাপীয় ব্যবস্থায়, যার রহস্য এখনো পুরোপুরি উন্মোচিত হয়নি।
মন্তব্য
প্রথম মন্তব্যটি করুন।