সমুদ্রপথে ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টাকারী অভিবাসনপ্রত্যাশীদের কাছ থেকে ২০২৫ সালে ৩৮৮ থেকে ৫০৯ মিলিয়ন ডলার আয় করেছে মানবপাচারকারী চক্রগুলো। জাতিসংঘের দুটি সংস্থা—মাদক ও অপরাধবিষয়ক দপ্তর (ইউএনওডিসি) এবং আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম)—বুধবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে।
প্রতিবেদন অনুসারে, গত বছর ইউরোপে প্রবেশের চারটি প্রধান সমুদ্রপথে মানবপাচারকারীদের সহায়তায় আনুমানিক ১ লাখ ৯০ হাজার থেকে ২ লাখ ৯ হাজার মানুষ যাত্রা করেছেন।
সেন্ট্রাল ভূমধ্যসাগরীয় পথ সবচেয়ে জনপ্রিয়
ইউরোপে পৌঁছানোর জন্য সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়েছে সেন্ট্রাল ভূমধ্যসাগরীয় পথ। উত্তর আফ্রিকা থেকে ইতালি ও মাল্টার সঙ্গে যুক্ত এই পথে ৮৪ হাজার থেকে ১ লাখ ৪০০ জন যাত্রা করেছেন বলে প্রতিবেদনে অনুমান করা হয়েছে।
আইওএমের জরিপে দেখা গেছে, উত্তর আফ্রিকা বা তুরস্ক থেকে এই পথে ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টা করা অভিবাসনপ্রত্যাশীদের প্রায় অর্ধেকই জনপ্রতি ৭ হাজার ৫০০ ডলারের বেশি ব্যয় করেছেন।
তবে রুটভেদে পাচারকারীদের নেওয়া অর্থের পরিমাণে বড় পার্থক্য রয়েছে। উত্তর-পশ্চিম আফ্রিকা থেকে স্পেনের ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জে যাওয়ার আটলান্টিক পথে জনপ্রতি ব্যয় সর্বনিম্ন ১৭০ ডলার পর্যন্ত হতে পারে।
সেন্ট্রাল ভূমধ্যসাগরীয় পথের পর দ্বিতীয় সর্বাধিক ব্যবহৃত পথ হলো পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় রুট। এই পথে ৪৮ হাজার ৪০০ থেকে ৫১ হাজার ৩০০ জন যাত্রা করেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তুরস্ক, লিবিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন এলাকার সঙ্গে গ্রিস, সাইপ্রাস ও বুলগেরিয়ার সংযোগ রয়েছে এই পথের।
এ ছাড়া আটলান্টিক মহাসাগর পেরিয়ে ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জে যাওয়ার পথে প্রায় ৩৩ হাজার যাত্রার হিসাব পাওয়া গেছে। উত্তর ও পশ্চিম আফ্রিকা থেকে স্পেনে যাওয়ার পশ্চিম ভূমধ্যসাগরীয় পথে যাত্রীর সংখ্যা ছিল প্রায় ২৪ হাজার ৫০০।
অর্থ দিয়েও নিশ্চিত নয় ইউরোপ যাত্রা
জাতিসংঘের প্রতিবেদন বলছে, ইউরোপে পৌঁছানোর আকাঙ্ক্ষাকে কাজে লাগিয়ে মানবপাচারকারী চক্রগুলো বিপুল অর্থ আয় করছে। অভিবাসনপ্রত্যাশীরা গন্তব্যে পৌঁছাতে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করলেও তাদের যাত্রা নিরাপদ নয়, এমনকি গন্তব্যে পৌঁছানোও নিশ্চিত নয়।
২০২৫ সালে ইউরোপে যাওয়ার সমুদ্রপথগুলোতে আনুমানিক ৩ হাজার ৪০৪ জন মারা গেছেন অথবা নিখোঁজ হয়েছেন। একই সময়ে সমুদ্রে ১ লাখ ৪ হাজার ২০০ জনকে আটক করে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মানবপাচারকারীদের সহায়তা নিচ্ছেন অধিকাংশ যাত্রী
ইউএনওডিসির হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সেন্ট্রাল ভূমধ্যসাগরীয় পথে যাত্রা করা ব্যক্তিদের ৭২ থেকে ৮৬ শতাংশ মানবপাচারকারীদের সহায়তা নিয়েছেন। আটলান্টিক পথে এই হার ছিল ৭৩ থেকে ৮৩ শতাংশ।
অন্যদিকে, পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় পথে ৭৫ থেকে ৯০ শতাংশ এবং পশ্চিম ভূমধ্যসাগরীয় পথে ৫৭ থেকে ৯০ শতাংশ যাত্রী পাচারকারীদের সহায়তা নিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
তবে সমুদ্রপথে অনিয়মিতভাবে ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টা করা প্রত্যেক ব্যক্তি মানবপাচারকারীদের সহায়তা নেন না বলে জানিয়েছে ইউএনওডিসি।
সংস্থাটির মতে, মানবপাচার একটি লাভজনক অপরাধ। অভিবাসনপ্রত্যাশীদের কাছ থেকে আদায় করা অর্থের পরিমাণ এই অপরাধী চক্রগুলোর আয়ের ব্যাপকতা তুলে ধরে। বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও এসব সমুদ্রযাত্রায় প্রাণহানির ঝুঁকি রয়েছে এবং ইউরোপে পৌঁছানোর নিশ্চয়তা মেলে না।