ভাবুন তো, বিমানবন্দরের ভেতরে হাজার হাজার মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা এভাবেই বসে আছেন। কেউ ঘড়ির দিকে তাকিয়ে সময় দেখছেন, কেউ মোবাইলে গেম খেলছেন, কেউ বই পড়ছেন, আবার কেউ কোনো কিছু না করেই অলস সময় পার করছেন। গন্তব্যে যেতে না পেরে আড়াই লাখেরও বেশি মানুষ আটকা পড়েছেন বিমানবন্দরের ভেতরে। স্বাভাবিক একটি যাত্রা মুহূর্তেই পরিণত হয়েছে দীর্ঘ অপেক্ষা আর অনিশ্চয়তায়।এর পেছনে রয়েছে ইন্দোনেশিয়ার বিখ্যাত আনাক ক্রাকাতোয়া আগ্নেয়গিরির ভয়াবহ অগ্ন্যুৎপাত। গত শুক্রবার ভোররাতে রাজধানী জাকার্তা থেকে প্রায় ১৫০ কিলোমিটার দূরে সুন্দা প্রণালিতে শুরু হয় এই অগ্ন্যুৎপাত। এরপর আগ্নেয়গিরি থেকে বের হওয়া ক্ষতিকর ছাই ছড়িয়ে পড়তে থাকে বিস্তীর্ণ এলাকায়। এর তীব্র প্রভাব পড়ে রাজধানী জাকার্তা এবং পাশের ল্যাম্পুং প্রদেশেও। আকাশে ছাইয়ের ঘন আস্তরণ তৈরি হওয়ায় বিমান চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।

বিবিসির তথ্য অনুযায়ী, পরিস্থিতি এতটাই গুরুতর হয়ে ওঠে যে জাকার্তার প্রধান সোয়েকার্নো-হাত্তা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ আটটি বিমানবন্দরের কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়। একে একে বাতিলও করা হয় প্রায় ৩ হাজার ফ্লাইট। ফলে চরম ভোগান্তিতে পড়েন ৩ লাখ ৪১ হাজারেরও বেশি যাত্রী। কারও সামনে নেই নির্দিষ্ট সময়ের নিশ্চয়তা, আবার কারও অপেক্ষার শেষও জানা নেই। তাই দীর্ঘ অপেক্ষার এই কঠিন সময় পার করতে বিমানবন্দরেই এখন চলছে মানুষের এক নীরব লড়াই।

আটকে থাকা এক যাত্রী নিজের অভিজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, বিমানবন্দরে দীর্ঘ সময় ধরে আটকে থাকতে হচ্ছে এবং যাত্রা কখন স্বাভাবিক হবে, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। এদিকে অগ্ন্যুৎপাতের ছাই শুধু বিমান চলাচলেই প্রভাব ফেলেনি, এর প্রভাব পৌঁছে গেছে শিক্ষাব্যবস্থাতেও। ছাই ছড়িয়ে পড়ার কারণে জাকার্তার সব স্কুল বন্ধ রাখা হয়েছে এবং শিক্ষার্থীদের অনলাইনে ক্লাস করার ব্যবস্থা করা হয়েছে। অর্থাৎ একটি আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের প্রভাব এখন মানুষের যাতায়াত থেকে শুরু করে পড়াশোনা দৈনন্দিন জীবনের নানা ক্ষেত্রেই ছড়িয়ে পড়েছে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আগ্নেয়গিরির চারপাশে নেওয়া হয়েছে কঠোর সতর্কতা। আগ্নেয়গিরির তিন কিলোমিটার এলাকার মধ্যে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে এবং স্থানীয়দের সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রেও সতর্কতা জারি করা হয়েছে। আকাশে ছাই, বিমানবন্দরে অপেক্ষারত হাজারো মানুষ আর বন্ধ স্কুল একটি অগ্ন্যুৎপাত কীভাবে মুহূর্তের মধ্যে স্বাভাবিক জীবনকে থামিয়ে দিতে পারে, ইন্দোনেশিয়ার বর্তমান পরিস্থিতিই যেন তার বাস্তব উদাহরণ। এখন সবার অপেক্ষা, কবে আকাশ থেকে সরে যাবে এই ছাইয়ের আস্তরণ আর কবে আবার স্বাভাবিক হবে বিমান চলাচল ও জনজীবন।

তবে দীর্ঘ অপেক্ষার পর এবার কিছুটা স্বস্তির খবর এসেছে। ইন্দোনেশিয়ার পরিবহন মন্ত্রণালয় আজ সকালে জানিয়েছে, তীব্র বাতাসের কারণে আকাশে ছড়িয়ে থাকা আগ্নেয় ছাইয়ের আস্তরণ দ্রুত সরে গেছে। ফলে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ায় জাকার্তার প্রধান সোয়েকার্নো-হাত্তা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ বিমানবন্দর আবারও চালু করা হয়েছে। একই সঙ্গে ধীরে ধীরে শুরু হয়েছে ফ্লাইট চলাচলও। অর্থাৎ যে আকাশপথ কয়েক ঘণ্টা আগেও ছাই আর অনিশ্চয়তায় থমকে ছিল, সেখানেই এখন ধীরে ধীরে ফিরতে শুরু করেছে স্বাভাবিকতার ছন্দ।