একসময় ‘নগদ টাকার ফসল’, এখন লোকসানের বোঝা - আলুতে দিশেহারা রংপুরের কৃষক। একসময় রংপুরের কৃষকের কাছে আলু ছিল স্বস্তির ফসল - মৌসুম শেষে আলু বিক্রির টাকায় চলত পরিবারের অনেক দিনের খরচ। কিন্তু সেই চিত্র এখন অনেকটাই বিবর্ণ। উৎপাদন খরচ বাড়ছে, অথচ বাজারে মিলছে না ন্যায্য দাম। তার ওপর সংরক্ষণের সীমাবদ্ধতা আর দুর্বল বিপণনব্যবস্থা - সব মিলিয়ে আলু এখন কৃষকের কাছে লাভের বদলে দুশ্চিন্তার নাম। গত এক যুগের হিসাবও বলছে একই কথা, ২০১৪ থেকে ২০২৫—১২ বছরে সাত বছরই আলু চাষে লোকসান গুনেছেন রংপুরের কৃষকেরা।
এই লোকসানের ধারাবাহিকতায় চলতি মৌসুমেও স্বস্তির খবর নেই। ২০২৫–২৬ মৌসুমে প্রতি কেজি আলু উৎপাদনে কৃষকের খরচ হয়েছে প্রায় ১৬ টাকা। মাঠ থেকে হিমাগার পর্যন্ত পরিবহন ও বস্তার খরচ যোগ হয়েছে আরও প্রায় ২ টাকা, আর হিমাগারে প্রতি কেজি সংরক্ষণে দিতে হয়েছে ৬ টাকা। সব মিলিয়ে কৃষকের কেজিপ্রতি ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৪ টাকা। অথচ বর্তমানে হিমাগার গেটে আলু বিক্রি হচ্ছে গড়ে মাত্র ১২ টাকায় - অর্থাৎ প্রতি কেজিতে লোকসান প্রায় ১২ টাকা। যদিও সরকার হিমাগার গেটে কেজিপ্রতি ২২ টাকা দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে।
দামের এই ব্যবধানেই আটকে আছে কৃষকের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা। রংপুরের ৪২টি হিমাগারে গত মৌসুমে সংরক্ষণ করা হয়েছিল প্রায় ৪ লাখ ৮৮ হাজার ৬৩৮ মেট্রিক টন আলু। এর বড় একটি অংশ এখনও বাজারে ছাড়ার অপেক্ষায় ছিল। কিন্তু ক্রেতার অনীহা আর কম দামের কারণে হিমাগার থেকে আলু বের করতেও অনেকে ভয় পাচ্ছেন। বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর শুধু রংপুরের আট উপজেলার কৃষকেরা প্রায় চার লাখ বস্তা আলু হিমাগার থেকে তোলেননি। এতে কৃষকদের আনুমানিক ৬০ কোটি টাকা এবং হিমাগার মালিকদের প্রায় দুই কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।
আর এই হিসাবের আড়ালেই রয়েছে কৃষকের জীবনের কঠিন বাস্তবতা। কেউ ঋণ নিয়ে আলু চাষ করেছেন, কেউ আবার লাভের আশায় বাড়তি আলু কিনে হিমাগারে রেখেছেন। কিন্তু বাজারে দাম না থাকায় সেই আলুই এখন বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এক কৃষকের ভাষায়, বছরের পর বছর আলুতে লোকসান করতে করতে তাঁরা নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছেন। কারও হিমাগারে শত শত বস্তা পড়ে আছে, কিন্তু কেজিপ্রতি এত বড় লোকসানে সেই আলু বের করে বিক্রি করাটাও যেন আর্থিক আত্মঘাতীতার মতো।
তবে সমস্যাটি শুধু দামেই সীমাবদ্ধ নয়; সংকটের আরেকটি বড় কারণ সংরক্ষণ সক্ষমতার ঘাটতি। রংপুর অঞ্চল থেকে দেশের প্রায় ২৫ শতাংশ আলু উৎপাদিত হলেও মোট উৎপাদনের মাত্র ২২ শতাংশ সংরক্ষণের সুযোগ রয়েছে। ফলে বিপুল পরিমাণ আলু মৌসুমে একসঙ্গে বাজারে চলে আসে। তখন সরবরাহ বেড়ে গিয়ে দাম পড়ে যায়, আর কৃষকের হাতে থাকে না দর-কষাকষির সুযোগ। কৃষি কর্মকর্তারাও মনে করছেন, পর্যাপ্ত হিমাগার, শক্তিশালী বাজারব্যবস্থা এবং প্রক্রিয়াজাত শিল্প না বাড়ালে এই চক্র থেকে বের হওয়া কঠিন।
এ অবস্থায় কৃষকদের দাবি, শুধু উৎপাদন বাড়ানোর পরামর্শ নয় - আলুর ন্যায্য দাম নিশ্চিত করতে কার্যকর নীতিগত সহায়তা দরকার। রংপুর আলুচাষি ও ব্যবসায়ী সমিতির পক্ষ থেকে উৎপাদন খরচের সঙ্গে অন্তত ৩৩ শতাংশ মূল্যসহায়তা যোগ করে দাম নির্ধারণ, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা করে ক্ষতিপূরণ, সহজ শর্তে কৃষিঋণ ও রপ্তানিতে প্রণোদনার দাবি উঠেছে। পাশাপাশি আলু দিয়ে চিপস, ফ্রেঞ্চ ফ্রাইসহ বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাত খাদ্য তৈরির শিল্প গড়ে তোলা এবং রপ্তানির বাজার সম্প্রসারণের ওপরও জোর দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
কারণ নতুন মৌসুমে আবারও জমিতে আলুর চারা গজাতে শুরু করেছে, কিন্তু কৃষকের মনে আগের সেই আশাবাদ নেই। ২০২৫–২৬ মৌসুমে রংপুরে প্রায় ১ লাখ ৬৫ হাজার ৫০০ কৃষক ৬৬ হাজার ৪৫০ হেক্টর জমিতে আলু আবাদ করে উৎপাদন করেছিলেন প্রায় ১৯ লাখ ৫৭ হাজার টন। এত বিপুল উৎপাদনের পরও যদি কৃষক উৎপাদন খরচ তুলতে না পারেন, তাহলে ‘নগদ টাকার ফসল’ ধীরে ধীরে তাদের কাছে হয়ে উঠবে লোকসানের ফসল। তাই সংরক্ষণ থেকে বাজার, প্রক্রিয়াজাতকরণ থেকে রপ্তানি - পুরো ব্যবস্থায় টেকসই পরিবর্তন না এলে রংপুরের আলুচাষির এই দীর্ঘশ্বাস থামবে না।