আনারস বাঁচানোর কারখানা, এখন নিজেই ধ্বংসের পথে। পাহাড়জুড়ে আনারসের সমারোহ, অথচ সেই আনারসই মৌসুমে অনেক সময় হয়ে ওঠে কৃষকের দুশ্চিন্তার কারণ। রাঙামাটির নানিয়ারচরে বড় আকারের আনারস সহজে বিক্রি হলেও ছোট ও মাঝারি ফলের ক্রেতা কম। ফলে ক্ষেত থেকে তোলা অনেক আনারস পড়ে থাকে রাস্তার পাশে, নষ্ট হয় পচে। এই অপচয় ঠেকাতেই প্রায় ৪০ লাখ টাকা ব্যয়ে তৈরি হয়েছিল আনারস প্রক্রিয়াজাত করে চিপস তৈরির কারখানা। কিন্তু যে কারখানা কৃষকের অবিক্রীত ফলকে সম্ভাবনাময় পণ্যে রূপ দেওয়ার কথা, সেটিই এখন পড়ে আছে অচল।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের বাস্তবায়ন করা ‘বছরব্যাপী ফল উৎপাদনের মাধ্যমে পুষ্টি উন্নয়ন’ প্রকল্পের আওতায় নানিয়ারচর হর্টিকালচার সেন্টারে স্থাপন করা হয় এই প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র। ২০২১ সালের জুনে আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধনের পর স্বপ্ন ছিল - পাহাড়ের আনারস আর নষ্ট হবে না, তৈরি হবে নতুন খাদ্যপণ্য, পাশাপাশি সৃষ্টি হবে কর্মসংস্থান। কিন্তু সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেওয়ার আগেই থেমে যায় কার্যক্রম। প্রকল্পের আওতায় পরীক্ষামূলকভাবে কিছুদিন উৎপাদন হলেও বাণিজ্যিকভাবে আর চালু হয়নি কারখানাটি।
কারখানা বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে থেমে গেছে সম্ভাবনার চাকাও। সরেজমিনে দেখা গেছে, তালাবদ্ধ ভবনের ভেতরে পড়ে আছে মূল্যবান যন্ত্রপাতি। দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় সেগুলোতে জমেছে ধুলোর আস্তরণ। কোথাও বৈদ্যুতিক তার ঝুলে আছে, আবার ছাদ ফুটো হয়ে বৃষ্টির পানি ঢুকছে ভেতরে। অর্থাৎ সময়ের সঙ্গে শুধু উৎপাদনই বন্ধ হয়নি, অযত্নে নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে সরকারি অর্থে গড়ে তোলা পুরো স্থাপনাটিও।
অথচ এই কারখানা চালু হলে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হওয়ার কথা ছিল স্থানীয় কৃষকদের। নানিয়ারচরের চাষিদের ভাষ্য, বড় আকারের আনারস পাইকারদের কাছে বিক্রি করা গেলেও ছোট ফল নিয়ে আগ্রহ কম ব্যবসায়ীদের। ফলে অনেক সময় কম দামে বিক্রি করতে হয়, না হলে ফল পড়ে থেকে নষ্ট হয়। কারখানায় এসব আনারস প্রক্রিয়াজাত করা গেলে একদিকে অপচয় কমত, অন্যদিকে কৃষকের হাতে আসতে পারত বাড়তি আয়। পাশাপাশি স্থানীয় তরুণদের জন্য তৈরি হতে পারত কাজের সুযোগ।
তাই কৃষকদের চোখে বন্ধ কারখানাটি শুধু একটি তালাবদ্ধ ভবন নয়, বরং অপূর্ণ থেকে যাওয়া একটি সম্ভাবনা। কৃষক মো. হানিফের মতে, কারখানাটি সচল হলে পড়ে থাকা আনারসও কাজে লাগত। আরেক চাষি মোহাম্মদ আলমগীরের প্রত্যাশা, এটি চালু হলে কৃষকের পাশাপাশি বেকার যুবকেরাও কর্মসংস্থানের সুযোগ পেতেন। অর্থাৎ পাহাড়ের ফলকে ঘিরে স্থানীয় অর্থনীতিতে যে নতুন স্রোত তৈরি হওয়ার কথা ছিল, কারখানা বন্ধ থাকায় সেই সুযোগও আটকে আছে।
কর্তৃপক্ষ অবশ্য বলছে, দক্ষ জনবল ও প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তার অভাবেই মূলত কারখানাটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা সম্ভব হয়নি। নানিয়ারচর উপজেলা উদ্যানতত্ত্ববিদ মো. জোবায়দুর রহমান ভাসানী জানান, কেন্দ্রটি সচল করার বিষয়ে ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে আলোচনা চলছে। রাঙামাটি বনরূপা হর্টিকালচার সেন্টারের উপপরিচালক মো. মাহবুবুর রশীদও জানিয়েছেন, প্রকল্পের সময় কিছুদিন কার্যক্রম চলেছিল এবং লোকজনকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল। তবে নিজস্ব আয়ে লাভজনকভাবে পরিচালনা সম্ভব না হওয়ায় সেটি বন্ধ হয়ে যায়।
এখন তাই সামনে একটাই প্রশ্ন - ৪০ লাখ টাকার এই বিনিয়োগ কি এভাবেই পড়ে থাকবে, নাকি নতুন ব্যবস্থাপনায় আবারও প্রাণ ফিরবে কারখানায়? কৃষি বিভাগ বলছে, সরকারি রাজস্ব খাতে নেওয়া কিংবা পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের মাধ্যমে বেসরকারি উদ্যোক্তাকে যুক্ত করে কেন্দ্রটি চালুর চেষ্টা চলছে। কারণ কারখানাটি সচল হলে শুধু যন্ত্রপাতিই বাঁচবে না, বাঁচবে পাহাড়ের কৃষকের বহু কাঙ্ক্ষিত ফলের একটি অংশও। আনারসের মৌসুমে যে ফল আজ পড়ে থেকে পচে যায়, সঠিক উদ্যোগে সেই ফলই হয়ে উঠতে পারে প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য, কৃষকের বাড়তি আয় আর স্থানীয় কর্মসংস্থানের নতুন দুয়ার।