তপ্ত রোদে পুড়ছে বরেন্দ্রের মাটি। একসময় যেখানে পানির অভাবে ফসল ফলানোই ছিল দুঃসাধ্য, সেখানেই এখন সবুজের সমারোহ। ডিজেল পাম্পের গর্জন কিংবা বিদ্যুতের অপেক্ষা নয় - মাথার ওপরের সূর্যই এখন কৃষকের সেচের শক্তি। সৌর প্যানেল থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতে চলছে পাম্প, আর সেই পানিতেই প্রাণ ফিরে পাচ্ছে অনাবাদী জমি।
এই বদলের ছোঁয়া সবচেয়ে স্পষ্ট রাজশাহীর মোহনপুরে। সৌরচালিত সেচের সুবিধা পেয়ে কৃষকেরা এখন ধান থেকে শুরু করে বেগুন, টমেটো, ফুলকপি, বাঁধাকপি ও মরিচ - চাষ করছেন নানা ধরনের ফসল। যে জমিতে আগে একটি ফসল ফলানোও কঠিন ছিল, সেখানেই কেউ কেউ বছরে তিনবার ধান উৎপাদনের স্বপ্ন বাস্তবে রূপ দিচ্ছেন। আর এই সাফল্যের পেছনে সবচেয়ে বড় স্বস্তি - সেচের পানির সহজলভ্যতা।
কৃষকদের ভাষ্য, আগে পানির জন্য পোহাতে হতো নানা দুর্ভোগ। দূরের জলাশয় থেকে ডিজেলচালিত পাম্পে দীর্ঘ পাইপ বসিয়ে জমিতে পানি আনতে হতো। সঙ্গে ছিল বাড়তি জ্বালানি খরচ; ফলে ফসল ঘরে তুলেও লাভের অঙ্কটা থাকত অনিশ্চিত। এখন সেই চিত্র বদলে গেছে। সূর্য উঠলেই চালু হচ্ছে সৌর পাম্প, আর জ্বালানি খরচ ছাড়াই পানি পৌঁছে যাচ্ছে মাঠে। একটি পাম্পের আওতায় প্রায় ২০ জন কৃষকের ৩০ থেকে ৩৫ বিঘা জমিতে মিলছে সেচ সুবিধা।
শুধু সেচের খরচ কমানো নয়, পানির নিশ্চয়তা বদলে দিয়েছে চাষের ধরনও। আগে আমন ধান আর শীতকালীন সবজি কিংবা ডালেই সীমাবদ্ধ ছিলেন অনেক কৃষক। এখন আউশ-বোরোর পাশাপাশি আগাম সবজি চাষেও বাড়ছে আগ্রহ। কোথাও অনুর্বর জমিতে ফলছে বেগুন, কোথাও প্রস্তুত হচ্ছে আগাম ফুলকপির চারা। ফলে একদিকে যেমন বাড়ছে জমির ব্যবহার, অন্যদিকে কৃষকের আয়ের পথও হচ্ছে আরও প্রশস্ত।
আর এই পরিবর্তনকে টেকসই করতে কৃষকদের নিয়েই গড়ে তোলা হয়েছে ব্যবস্থাপনা কমিটি। অর্থাৎ সৌর সেচের সুবিধা কোনো একক কৃষকের হাতে সীমাবদ্ধ নয়; যৌথ ব্যবস্থাপনায় তা পৌঁছে যাচ্ছে একাধিক চাষির জমিতে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উদ্যোগে বরেন্দ্র অঞ্চলের এমন এলাকাগুলোতে সৌর সেচ ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, যেখানে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়ায় প্রচলিত গভীর নলকূপের সক্ষমতা কমে এসেছে।
গত দুই বছরে রাজশাহী বিভাগে স্থাপন করা হয়েছে ৩২টি সৌর সেচ পাম্প। এর মধ্যে রয়েছে স্থায়ী, বহনযোগ্য ও নির্দিষ্ট বাগানের জন্য প্রিসিশন সেচ ব্যবস্থা। প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিটি সৌর পাম্প স্থাপনে খরচ হয়েছে প্রায় ৫ লাখ টাকা। ছয়টি সৌর প্যানেল থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতে দুই অশ্বক্ষমতার পাম্প সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত ২০ থেকে ২৫ বিঘা জমিতে পানি দিতে পারে। এতে সেচ ব্যয় নেমে এসেছে প্রায় শূন্যের কোঠায়, আর বেড়েছে জমিতে ফসল উৎপাদনের ঘনত্ব।
বরেন্দ্রের কৃষিতে তাই সৌর সেচ এখন শুধু বিকল্প প্রযুক্তি নয়, হয়ে উঠছে সম্ভাবনার নতুন দুয়ার। বিশেষ করে বিদ্যুৎ সংযোগহীন দুর্গম এলাকায় এর কার্যকারিতা আরও বেশি। সংশ্লিষ্টদের পরিকল্পনা, ভবিষ্যতে প্রচলিত ডিজেল ও বিদ্যুৎচালিত পাম্পেও সৌর প্রযুক্তি যুক্ত করা। তবে অতিরিক্ত সৌরবিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হলে উদ্যোগটি আরও কার্যকর হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ কৃষিতে সেচ যখন উৎপাদনের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি, তখন বরেন্দ্রের তপ্ত মাটিতে সূর্যের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে পানির এই নতুন পথই হয়ে উঠতে পারে কৃষকের সোনালী স্বপ্নের সেচনির্ভর বাস্তবতা।