পাহাড়ের ঢালে এখন সোনালি ব্যস্ততা। কোথাও কাস্তের ছোঁয়ায় কাটা পড়ছে পাকা জুম ধান, কোথাও চলছে মাড়াই, আবার কোথাও ঘরে তোলার প্রস্তুতি। খাগড়াছড়ির পাহাড়জুড়ে জুমের ফসল ঘিরে এমন কর্মচাঞ্চল্য থাকলেও এর আড়ালেই দেখা দিচ্ছে ভিন্ন এক চিত্র। ভালো ফলনের হাসির সঙ্গে জুম চাষের ভবিষ্যৎ নিয়ে বাড়ছে শঙ্কাও। কারণ সময়ের সঙ্গে সংকুচিত হচ্ছে এই পাহাড়ি কৃষির পরিসর।
একসময় পাহাড়ের বিস্তীর্ণ ঢালে নিয়মিত চাষ হতো জুম। কিন্তু এখন সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের তথ্য বলছে, ২০২০-২১ অর্থবছরে খাগড়াছড়িতে প্রায় ২ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে জুম চাষ হয়েছিল। পাঁচ বছরের ব্যবধানে চলতি মৌসুমে সেই পরিমাণ নেমে এসেছে প্রায় ১ হাজার ১৫০ হেক্টরে। অর্থাৎ কমেছে প্রায় ১ হাজার ৩৫০ হেক্টর, যা মোট জমির অর্ধেকেরও বেশি। আর জমি কমার সঙ্গে সঙ্গে কমছে জুমনির্ভর পরিবারের সংখ্যাও।
জুমচাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এর পেছনে রয়েছে নানা কারণ। পাহাড়ে বাড়ছে বসতি, গড়ে উঠছে ফলজ বাগান ও বিভিন্ন স্থাপনা; ফলে জুমের জন্য খালি পাহাড় খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। পাশাপাশি সার, কীটনাশক ও শ্রমিকের মজুরি বাড়ায় বেড়েছে উৎপাদন ব্যয়ও। সীমানা পাড়ার জুমচাষি মিলন ত্রিপুরার নিজের জমি না থাকায় অন্যের পাহাড়ে জুম করতে হয়। ৩০ থেকে ৩৫ মণ ধান পেলেও বাড়তি খরচের কারণে লাভের অঙ্কটা আগের মতো থাকছে না। তার ওপর সন্তানদেরও এই পেশায় আগ্রহ নেই।
তবে জমি ও শ্রমের সংকটের মাঝেও এবারের জুমে মিলেছে স্বস্তির খবর। মরাটিলা এলাকায় ভালো ফলন হয়েছে বলে জানান স্থানীয় চাষিরা। কিন্তু সেখানেও জুমের পরিধি আগের তুলনায় অনেক ছোট। জনবসতি বিস্তারের পাশাপাশি পাহাড়ের বিভিন্ন অংশে ফলের বাগান গড়ে ওঠায় চাষযোগ্য জায়গা কমছে। দীর্ঘমেয়াদি আয়ের আশায় অনেকেই ফলজ বাগানকে বেছে নিচ্ছেন, আর অন্যদিকে জুমনির্ভর পরিবারগুলো হারাচ্ছে চাষের জায়গা। ফলে ভালো ফলন এলেও জুমের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
আর জুমের জমি কমার প্রভাব শুধু ধানের মাঠেই থেমে নেই। জুমে ধানের পাশাপাশি ভুট্টা, তিল, কাউন, মারফা ও মরিচসহ নানা ফসল চাষ হয়। ফলে একটি পাহাড়ি পরিবারের খাদ্য ও আয়ের বৈচিত্র্য তৈরিতে জুমের রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। চাষের জমি কমে গেলে সেই বহুমুখী উৎপাদনের সুযোগও সংকুচিত হয়। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শ্রমিক সংকট ও তরুণ প্রজন্মের অনাগ্রহ। কঠোর পরিশ্রমের তুলনায় অনিশ্চিত আয় - এ কারণেই অনেকে জুম ছেড়ে অন্য পেশার দিকে ঝুঁকছেন। এতে শুধু একটি কৃষিপদ্ধতিই নয়, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা পাহাড়ের কৃষিজ্ঞানও হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
তবে জুমের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে মাঠপর্যায়ে কাজ করছে কৃষি বিভাগ। এ বছর চাষিদের দেওয়া হয়েছে উন্নত জাতের ধানবীজ ও সার। ব্রি-৮৩, বিনা-১৯ ও বিনা-২১ জাতের ধানও চাষ হয়েছে জুমের পাহাড়ে। কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, নিয়মিত বৃষ্টি ও উন্নত জাতের কারণে এবার ফলন ভালো হয়েছে। পাশাপাশি জুমে আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি ও উন্নত জাত ব্যবহারে চাষিদের পরামর্শও দেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ কম জমিতে বেশি ফলন নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে, যাতে সীমিত সম্পদেও কৃষকের উৎপাদন ধরে রাখা যায়।
তবে উৎপাদন বাড়ানোর এই উদ্যোগের পাশাপাশি জুমের জমি সংকোচনের কারণগুলোও গুরুত্ব দিয়ে দেখা জরুরি। কারণ হেক্টরপ্রতি ফলন বাড়লেও জমিই যদি ক্রমাগত কমে যায়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে এই কৃষিব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত পরিবার ও উৎপাদন - দুটিই সংকুচিত হবে। খাগড়াছড়িতে পাঁচ বছরে জুম চাষের জমি প্রায় ৫৪ শতাংশ কমে যাওয়ার পরিসংখ্যান সেই বার্তাই দিচ্ছে। তাই পাহাড়ের ঢালে সোনালি ধানের এই ঐতিহ্য ধরে রাখতে প্রয়োজন জমির সুষ্ঠু ব্যবহার, চাষিদের সহায়তা এবং নতুন প্রজন্মকে এই কৃষির সঙ্গে যুক্ত রাখার কার্যকর উদ্যোগ। নইলে একদিন হয়তো পাহাড়ে জুমের সোনালি ফসল থাকবে, কিন্তু সেই ফসল ঘরে তোলার মানুষই কমে যাবে।