ফসলের জমিতে পোকা দেখলেই অনেকের চোখে ভেসে ওঠে ক্ষতির আশঙ্কা। পাতায় পোকার আনাগোনা, গাছে ক্ষতের চিহ্ন কিংবা ফলের গায়ে দাগ - এমন দৃশ্য দেখলেই অনেক সময় শুরু হয় কীটনাশক প্রয়োগ। অথচ জমিতে থাকা প্রতিটি পোকাই ফসলের শত্রু নয়। কোনো পোকা পরাগায়নে সহায়তা করে, কোনোটি ক্ষতিকর পোকার ডিম ও লার্ভা খেয়ে সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রাখে, আবার কিছু পোকা মাটির স্বাভাবিক জৈবিক প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখে। তাই পোকা দেখলেই তা ধ্বংস করার প্রবণতা কৃষির স্বাভাবিক ভারসাম্যের জন্য হয়ে উঠতে পারে বড় ঝুঁকি।
এই ভারসাম্যের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশই হলো কৃষিজমির পোকামাকড়ের বৈচিত্র্য। একটি জমিতে ক্ষতিকর পোকার পাশাপাশি শিকারি, পরজীবী ও পরাগায়নকারী নানা ধরনের পোকা সক্রিয় থাকে। তারা পরস্পরের সঙ্গে খাদ্যশৃঙ্খল ও পরিবেশগত সম্পর্কে যুক্ত। কিন্তু নির্বিচারে কীটনাশক ছিটালে ক্ষতিকর পোকার সঙ্গে উপকারী পোকাও মারা পড়ে। এতে প্রকৃতির নিজস্ব বালাই নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে যায়। আর সেই দুর্বলতা থেকেই কৃষি ধীরে ধীরে আরও বেশি রাসায়নিকনির্ভর হয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
তাই কীটনাশক ব্যবহারের সিদ্ধান্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হওয়া উচিত ‘পোকা দেখা’ নয়, ‘পোকাকে চেনা’। কোনটি ক্ষতিকর, কোনটি উপকারী এবং ক্ষতিকর পোকার উপস্থিতি কখন ফসলের জন্য অর্থনৈতিক ক্ষতির পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে - এসব বিবেচনা করেই ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। কারণ অনেক শিকারি ও পরজীবী পোকা কৃষকের জন্য প্রকৃতির দেওয়া এক ধরনের বিনামূল্যের বালাই নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা। এই বিষয়টিকেই গুরুত্ব দেয় সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা বা আইপিএম। যেখানে অকারণে রাসায়নিক প্রয়োগের বদলে প্রয়োজন অনুযায়ী রাসায়নিক, জৈবিক, শারীরিক ও কৃষিতাত্ত্বিক পদ্ধতির সমন্বয়ের কথা বলা হয়।
কিন্তু প্রয়োজন না বুঝে কিংবা একই ধরনের কীটনাশক বারবার ব্যবহার করলে তৈরি হতে পারে আরও জটিল সমস্যা। এর মধ্যে অন্যতম ‘থ্রি আর’ - রেজিস্ট্যান্স, রিসারজেন্স ও রেসিডিউ। প্রথমটি রেজিস্ট্যান্স বা প্রতিরোধক্ষমতা। একই কার্যপদ্ধতির কীটনাশক বারবার প্রয়োগ করা হলে ক্ষতিকর পোকার একটি অংশ ধীরে ধীরে সেই রাসায়নিকের বিরুদ্ধে সহনশীল হয়ে উঠতে পারে। ফলে যে ওষুধ একসময় কার্যকর ছিল, পরবর্তী সময়ে সেটিই কম কাজ করতে পারে। তখন মাত্রা বাড়ানো কিংবা অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী ওষুধ ব্যবহারের প্রবণতা তৈরি হয়, যা সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
একটি সমস্যা কাটতে না কাটতেই সামনে আসে দ্বিতীয় ‘আর’ - রিসারজেন্স বা পোকার পুনরুত্থান। কীটনাশক দেওয়ার পর ক্ষতিকর পোকার সংখ্যা সাময়িকভাবে কমে গেলেও একই সঙ্গে যদি তাদের প্রাকৃতিক শত্রু ও উপকারী পোকা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে পরবর্তী সময়ে ক্ষতিকর পোকা দ্রুত আবার বেড়ে যেতে পারে। অর্থাৎ যে ওষুধ দিয়ে পোকা দমন করা হয়েছিল, সেটিই পরোক্ষভাবে ভবিষ্যতে পোকার বাড়বাড়ন্তের পরিবেশ তৈরি করতে পারে। অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারের সঙ্গে এমন পুনরুত্থান ও গৌণ পোকার আক্রমণের ঝুঁকির কথাও কৃষিবিজ্ঞানীরা উল্লেখ করেন।
আর তৃতীয় ‘আর’ হলো রেসিডিউ বা কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ। অতিরিক্ত কিংবা ভুল মাত্রায় ওষুধ প্রয়োগ, অথবা ফসল সংগ্রহের আগে নির্ধারিত অপেক্ষাকাল না মানলে খাদ্য ও পরিবেশে রাসায়নিকের অবশিষ্টাংশ থাকার ঝুঁকি তৈরি হয়। ফলে বিষয়টি শুধু জমি বা ফসল রক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এর সঙ্গে জড়িয়ে যায় নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন ও পরিবেশ সুরক্ষার প্রশ্নও। তাই তাৎক্ষণিকভাবে একটি পোকা দমন করলেই সমস্যার সমাধান হচ্ছে - এমন সরল হিসাব কৃষিতে সবসময় কার্যকর নয়।
কারণ আজ জমিতে একটি পোকা দেখেই নেওয়া সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়তে পারে আগামী মৌসুমেও। ক্ষতিকর পোকার সংখ্যা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি উপকারী জীবের অস্তিত্ব ধরে রাখা, কীটনাশকের কার্যকারিতা বজায় রাখা এবং খাদ্য ও পরিবেশকে নিরাপদ রাখা - সবকিছুকেই বিবেচনায় নিতে হবে। তাই টেকসই কৃষির পথ হতে পারে পোকা দেখলেই ওষুধ নয়; আগে শনাক্তকরণ, এরপর ক্ষতির মাত্রা নিরূপণ, তারপর প্রয়োজন অনুযায়ী সমন্বিত ব্যবস্থা। জমির প্রতিটি পোকাকে শত্রু না ভেবে প্রকৃতির এই সূক্ষ্ম ভারসাম্যকে বুঝেই কৃষিকে এগিয়ে নেওয়াই হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের চাবিকাঠি।