পুতিন, শি জিনপিং, নরেন্দ্র মোদি ও ইরানের প্রেসিডেন্ট বেজেশকিয়ান একই জোটের গুরুত্বপূর্ণ নেতা। আবার একই জোটে রয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইরান । বিশ্বের প্রায় অর্ধেক মানুষ এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রায় ৪০ শতাংশের প্রতিনিধিত্বকারী এই জোটের নেতারা এখন নয়াদিল্লিতে। এদিকে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ নিয়েও আলোচনা রয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী হুমায়ুন কবির সংবাদ সম্মেলনে জানান, ব্রিকসের আয়োজক দেশ ভারত মূলত বিমসটেকের বর্তমান চেয়ারম্যান হিসেবে তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ পাঠিয়েছিল। তবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে কোনো পৃথক আমন্ত্রণ না থাকায় ঢাকা সম্মেলনে অংশ নেওয়া থেকে বিরত থাকে।

প্রশ্ন হচ্ছে, ব্রিকস কি পশ্চিমা বিশ্বের প্রভাবের বিকল্প শক্তি হয়ে উঠছে, নাকি সদস্য বাড়ার সঙ্গে ভেতরের বিভাজনও স্পষ্ট হচ্ছে? জ্বালানি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ঘিরে বিশ্ব রাজনীতিতে চাপের মধ্যেই তাই এবারের সম্মেলনের দিকে নজর সবার। ব্রিকস মূলত উদীয়মান ও উন্নয়নশীল অর্থনীতির দেশগুলোর সহযোগিতা জোট। ২০০১ সালে ধারণাটি সামনে আসে, ২০০৯ সালে ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত ও চীন আনুষ্ঠানিকভাবে সহযোগিতা শুরু করে। ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা যোগ দিলে নাম হয় ব্রিকস। পরে ২০২৪ সালে চারটি এবং ২০২৫ সালে ইন্দোনেশিয়া যোগ দেওয়ায় সদস্য সংখ্যা দাঁড়ায় ১১টি দেশে। ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ নয়াদিল্লির ভারত মণ্ডপে বসেছে ১৮তম ব্রিকস সম্মেলন। আর ২০২৬ সালে জোটটির সভাপতিত্ব করছে ভারত।

সংখ্যার হিসাবেও ব্রিকসের শক্তি বিশাল। ভারতের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ১১টি সদস্যদেশ মিলে বিশ্বের প্রায় ৪৯ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষের প্রতিনিধিত্ব করে। বৈশ্বিক জিডিপির প্রায় ৪০ শতাংশ এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যের প্রায় ২৬ শতাংশের সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততা রয়েছে। বিপুল জ্বালানি ও প্রাকৃতিক সম্পদ, শিল্প উৎপাদন, বড় বাজার ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার কারণে ব্রিকস শুধু বৈঠকের মঞ্চ নয়। সদস্যরা নিজেদের মুদ্রায় বাণিজ্য বাড়ানো ও বিকল্প পেমেন্ট ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করছে। তবে ডলারের অবস্থান এখনো অত্যন্ত শক্তিশালী। তাই রাতারাতি ডলারের বিকল্প তৈরি হচ্ছে না বরং লক্ষ্য হলো ডলারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানো।

তবে ব্রিকসের সবচেয়ে বড় শক্তিই আবার এর বড় দুর্বলতা। কারণ সদস্যদের স্বার্থ সব সময় এক নয়। ভারত ও চীনের সীমান্ত বিরোধ এবং বাণিজ্য সমস্যা এখনো রয়েছে। আবার ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত একই জোটে থাকলেও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সংকটে তাদের অবস্থান এক নয়। অন্যদিকে ভারত রাশিয়ার সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক ধরে রেখেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সঙ্গে ভারসাম্য বজায় রাখছে। সব মিলিয়ে ব্রিকস এখনই পশ্চিমা বিশ্বের বিকল্প কোনো ঐক্যবদ্ধ রাজনৈতিক বা সামরিক জোট নয় বরং উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রভাব বাড়ানোর একটি প্ল্যাটফর্ম। তাই শেষ প্রশ্ন একটাই এত ভিন্ন স্বার্থের দেশ কি সত্যিই একটি অভিন্ন শক্তি হিসেবে কাজ করতে পারবে? আর পারলে, বিশ্ব শক্তির ভারসাম্য কি সত্যিই বদলে যাবে?