৪ বছর পর ভারতের জার্সিতে ভুবনেশ্বর কুমার। একটা কোটি কোটি প্রার্থনার প্রত্যাবর্তন.. যেটা কোন ফিরে আসার ছট গল্প নয়, বরং একতা পূর্ণদৈঘ্য সিনেমা। যে সিনেমার নায়ক হাল ছাড়েন না, শেষ দৃশ্যটা লেখার দায়িত্বটা ছেড়ে দেন না ভাগ্যের হাতে। ভুবনেশ্বর প্রত্যাবর্তনটা ঠিক তেমনই!

২২ নভেম্বর ২০২২। নেপিয়ারে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি সিরিজের শেষ ম্যাচে মাঠে নেমেছিল ভারত। সেদিনই শেষবারের মতো ভারতের জার্সিতে দেখা গিয়েছিল ভুবিকে। 

সেই যে বাদ পড়েন.. এরপর পরিস্থিতি এমন দাঁড়ায়, মনে হচ্ছিল টিম ইন্ডিয়ায় ভুবনেশ্বরের প্রয়োজন বুঝি ফুরিয়েই গেছে। ২০২৩ সালের মাঝামাঝি সময়ে এসে যেন ভুবি নিজেও হালটা ছেড়েই দিয়েছিলেন। ইনস্টাগ্রাম বায়ো থেকে ‘ইন্ডিয়ান ক্রিকেটার’ পরিচয়টাও সরিয়ে নেন। 

এভাবেই কেটে গেছে সময়। ভারতের ক্রিকেটে কত পালাবদল, কত নতুন মুখের আগমন, কত পুরোনো মুখের বিদায়! এর মধ্যে ভারত জিতেছে জোড়া টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ, চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি। সময়ের স্রোতে হারিয়ে যাওয়ারই কথা ছিল সুইংয়ের জাদুকর খ্যাত এই পেসারে নামটাও। কিন্তু ভুবনেশ্বর হারিয়ে যেতে রাজি ছিলেন না।

জাতীয় দলের দরজা বন্ধ ছিল, কিন্তু নিজের জন্য ক্রিকেটের দরজাটা কখনো বন্ধ হতে দেননি তিনি। নিজে ট্রেনার, কোচ ভারা করে অনুশীলন চালিয়ে গেছেন.. একা একা। ঘরোয়া ক্রিকেটে লড়েছেন, আইপিএলে বল হাতে নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছেন। ২০২৫ আইপিএলে ১৭ উইকেট নিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, ব্যাটারদের রানের উৎসবে লাগাম টানতে এখনো সিদ্ধহস্ত তিনি। এড়পরও যে দু'একজনের সন্দেহ ছিলো ভুবির প্রতি.. তাদেরকেও জবাবটা দিয়েছেন ২০২৬ আইপিএলে। এবার তো নিজেকেই ছাড়িয়ে গেলেন! ২৮ উইকেট নিয়ে বুঝিয়ে দিলেন, বয়স বাড়লেই ধার কমে না; অভিজ্ঞতা অস্ত্রকে আরও শাণিত করে।

আইপিএলে ভুবির বোলিং দেখার পর ক্রিকেটপ্রেমীদের অপেক্ষা ছিল একটাই.. আবার কবে দেখা যাবে সুইং কিংকে, টিম ইন্ডিয়ার জার্সিতে?

অবশেষে ফিরলেন তিনি। যে নিউজিল্যান্ড সফরের পর জাতীয় দল থেকে হারিয়ে গিয়েছিলেন, সেই নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজের দলেই আবার ডাক পেলেন ভুবি। তবে ভক্তদের মতোই ক্রিকেট বিধাতারও যেন তর সইছিলো না আর.. তাইতো, কিউই সিইরজ অবধি অপেক্ষা নয়, উইন্ডিজদের বিপক্ষে দেশের মাটিতেই হবে সুইং কিংইয়ের প্রত্যাবর্তন। আর্শ্বদিবের ইঞ্জুরিতে পেলেন ডাক।

প্রত্যাবর্তনের মঞ্চটাও আবার নিজের ঘর.. বেঙ্গালুরুর, চিন্নাস্বামী স্টেডিয়াম। যে মাঠে ২০১২ সালে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক হয়েছিল, যে মাঠ তার আইপিএল দল আরসিবির ঘরের মাঠ, সেই মাঠেই প্রায় চার বছর পর আবার ভারতের জার্সি গায়ে ভুবনেশ্বের। কী অদ্ভুত এক বৃত্তপূরণ! যেন গল্পের চিত্রনাট্য নিজেই নিজের শেষটা লিখে রেখেছিল।

কিন্তু সিনেমার সবচেয়ে আবেগী দৃশ্যটা তো তখনো বাকি! ভুবির প্রত্যাবর্তনের ম্যাচ আর মাঠে গড়ায় না। বেঙ্গালুরুতে অঝর বৃষ্টি। আকাশ ভেঙে পানি ঝরছে। আর ক্রিকেটপ্রেমীরা বলতে শুরু করলেন, এত দিনের অপেক্ষা, এত লড়াইয়ের পর প্রিয় ভুবনেশ্বরের প্রত্যাবর্তন দেখে প্রকৃতিও বুঝি চোখের পানি ধরে রাখতে পারেনি!

রোমান্টিক শোনায়, তাই না? অথচ ভুবনেশ্বরের গল্পের সবচেয়ে সুন্দর দিকটা হলো, তাঁর প্রত্যাবর্তন উদ্‌যাপনের জন্য কোনো অলৌকিক গল্পের প্রয়োজন নেই। তাঁর লড়াই, তাঁর ধৈর্য, তাঁর পারফরম্যান্সই যথেষ্ট।

বৃষ্টির কারণে ম্যাচটা পরিত্যক্ত হয়েছে। ভুবি বল হাতে নিজের প্রত্যাবর্তনকে রাঙানোর সুযোগ পাননি। কিন্তু সব প্রত্যাবর্তনের পূর্ণতা কি উইকেট দিয়ে মাপা যায়? কখনো কখনো দলে ফেরাটাই সবচেয়ে বড় জয়। দীর্ঘ অপেক্ষার পর আবার দেশের নাম লেখা জার্সিটা চাপিয়েছেন গায়ে।

এবার অবশ্য জার্সিতে নম্বরটা সেই আইকনিক ১৫ নয়, বদলে গেছে ৭৮-এ। তবে ৭ আর ৮-এর যোগফল তো ১৫-ই হয়! সেই চিরচেনা বি কুমার ফিফটিন।

স্বাগতম, ভুবি! ক্রিকেটের মঞ্চে তোমার গল্পটা এখনো শেষ হয়নি।