বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বহর আধুনিকায়নের উদ্যোগের অংশ হিসেবে চলতি ২০২৬ সালের মধ্যেই এয়ারবাসের অন্তত একটি উড়োজাহাজ সরবরাহের অনুরোধ জানিয়েছেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত।

তিনি বলেছেন, এয়ারবাসের আধুনিক প্রজন্মের উড়োজাহাজ বিমানের বহরে যুক্ত হলে সংস্থাটির সক্ষমতা বাড়বে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহন বাজারে আরও কার্যকরভাবে প্রতিযোগিতা করার সুযোগ তৈরি হবে।

বুধবার (৭ অক্টোবর) রাতে রাজধানীর র‌্যাডিসন ব্লু ঢাকা ওয়াটার গার্ডেন হোটেলে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ও ইউরোপীয় উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এয়ারবাসের মধ্যে চুক্তি সই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি।

মন্ত্রী বলেন, এয়ারবাসের সঙ্গে চুক্তি দেশের এভিয়েশন খাতের জন্য একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। এটি কেবল উড়োজাহাজ কেনার বাণিজ্যিক চুক্তি নয়; এর মাধ্যমে বিমানকে আধুনিক, প্রতিযোগিতামূলক ও বিশ্বের বিভিন্ন গন্তব্যের সঙ্গে আরও ভালোভাবে সংযুক্ত একটি এয়ারলাইন হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য এগিয়ে যাবে।

তিনি বলেন, বিমানের একটি উড়োজাহাজ যখন বিদেশের কোনো গন্তব্যে যায়, তখন সেখানে বাংলাদেশের পরিচয়ও পৌঁছে যায়। দেশের অর্থনীতি সম্প্রসারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য আকাশপথের চাহিদাও বাড়ছে।

দেশের আন্তর্জাতিক যাত্রীদের বড় একটি অংশ বর্তমানে বিদেশি এয়ারলাইনসে যাতায়াত করেন উল্লেখ করে এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত বলেন, মাত্র প্রায় ২০ শতাংশ যাত্রী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের মাধ্যমে যাতায়াত করেন। বাকি প্রায় ৮০ শতাংশ অন্য এয়ারলাইনস ব্যবহার করেন। ফলে দেশের যাত্রীদের আরও বেশি আন্তর্জাতিক গন্তব্যে পরিবহনের জন্য বিমানের নিজস্ব বহর বাড়ানো ও আধুনিক করা জরুরি।

তিনি আরও বলেন, নতুন প্রজন্মের এয়ারবাস উড়োজাহাজ যুক্ত হলে বিভিন্ন রুটের চাহিদা ও যাত্রীর সংখ্যা অনুযায়ী আরও কার্যকরভাবে বহর পরিচালনা করা সম্ভব হবে। বর্তমানে উড়োজাহাজের সংকটের কারণে যাত্রীদের চাহিদা অনুযায়ী সেবা দিতে বিমানকে নানা সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।

এ কারণে এয়ারবাসের আঞ্চলিক পর্যায়ের শীর্ষ কর্মকর্তার প্রতি বিশেষ অনুরোধ জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, ২০২৬ সালের মধ্যেই যেন অন্তত একটি উড়োজাহাজ বাংলাদেশকে সরবরাহ করা হয়।

বিমানের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরে তিনি বলেন, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসকে বিশ্বের অন্যতম সেরা এয়ারলাইনসে পরিণত করাই সরকারের লক্ষ্য। এ জন্য এয়ারবাসের পাশাপাশি বোয়িংয়ের সঙ্গেও কাজ করতে হবে। একই সঙ্গে প্রয়োজন অনুযায়ী উড়োজাহাজের বহর, রুট ও অবকাঠামো উন্নয়ন করতে হবে।

বাংলাদেশকে আঞ্চলিক এভিয়েশন হাবে পরিণত করার পরিকল্পনার কথাও জানান বিমানমন্ত্রী। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে দেশে মেইনটেন্যান্স, রিপেয়ার অ্যান্ড ওভারহল (এমআরও) সুবিধা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) আওতায় এ প্রকল্পে ইউরোপের বিনিয়োগকারীদের অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

বক্তব্যে দেশের এয়ার কার্গো খাতের সমস্যাও তুলে ধরেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, ২০১৭ সালের জুন থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) বাংলাদেশ থেকে যাওয়া কার্গো ও মেইলকে উচ্চঝুঁকির তালিকায় রেখেছে। ইইউর উদ্বেগ দূর করতে বাংলাদেশ এরই মধ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে।

তিনি জানান, যুক্তরাজ্যের ডিপার্টমেন্ট ফর ট্রান্সপোর্টসের সাম্প্রতিক মূল্যায়নে ২০২৬ সালের ১৭ জুলাই ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ৯৮ শতাংশ এবং হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ৯৪ শতাংশ স্কোর পেয়েছে। এ অবস্থায় বাংলাদেশ থেকে কার্গো পরিবহনের ওপর থাকা বিধিনিষেধ দ্রুত প্রত্যাহারে ইইউর সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।

বিমানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উদ্দেশে মন্ত্রী বলেন, শুধু নতুন উড়োজাহাজ যুক্ত করলেই একটি এয়ারলাইনসকে সফল করা যায় না। বিমানের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে কর্মীদের পেশাদারত্ব, দক্ষতা, শৃঙ্খলা ও দায়িত্বশীলতার ওপর। প্রতিটি যাত্রীকে সেবা দেওয়া থেকে শুরু করে ফ্লাইট পরিচালনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ—সব ক্ষেত্রেই বাংলাদেশের ভাবমূর্তি জড়িত।

তিনি বিমানে নিরাপত্তা, দক্ষতা, সময়ানুবর্তিতা, সততা ও উৎকর্ষের সংস্কৃতি গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন।

চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির, এয়ারবাস ইন্ডিয়া ও দক্ষিণ এশিয়ার প্রেসিডেন্ট ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক জুর্গেন ওয়েস্টারমায়ারসহ দেশি-বিদেশি বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

এ ছাড়া ঢাকায় নিযুক্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার, যুক্তরাজ্যের রাষ্ট্রদূত সারাহ কুক, জার্মানির রাষ্ট্রদূত রুডিগার লোটজ, ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত জ্যঁ-মার্ক সেরে-শারলে, স্পেনের রাষ্ট্রদূত গ্যাব্রিয়েল মারিয়া সিসতিয়েগা ওচহোওয়া দি চিনচিত্রু, বিমানের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান রুমি এ হোসেন, ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) কাইজার সোহেল আহমেদ এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ উপস্থিত ছিলেন।

অনুষ্ঠানে ভিডিও বার্তার মাধ্যমে বক্তব্য দেন এয়ারবাসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা গিয়োম ফোরি।