চট্টগ্রাম বন্দরের নিউ মুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ও ওভারফ্লো কনটেইনার ইয়ার্ড (ওসিওয়াই) ১৫ বছরের জন্য পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে দেওয়ার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। বাংলাদেশ ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে এ-সংক্রান্ত চুক্তি আগামীকাল বৃহস্পতিবার ঢাকায় সই হওয়ার কথা।
চুক্তির বিরোধিতা করে বন্দর অচল করে দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন শ্রমিক ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংগঠনের নেতারা। সরকারি আমন্ত্রণপত্র অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টায় ঢাকার ইনভেস্ট বাংলাদেশ মিলনায়তনে চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠান হবে। এতে ইনভেস্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন এবং ডিপি ওয়ার্ল্ডের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান ঈসা কাজিম উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।
এনসিটি বিদেশি অপারেটরের হাতে দেওয়ার সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবিতে গতকাল চট্টগ্রাম বন্দরের প্রশাসনিক ভবনের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করে বন্দর রক্ষা কমিটি। এতে বন্দরকেন্দ্রিক শ্রমিক-কর্মচারী সংগঠন ছাড়াও রাজনৈতিক ও পেশাজীবী সংগঠনের নেতারা অংশ নেন। কর্মসূচির কারণে দুপুর দেড়টা পর্যন্ত প্রশাসনিক ভবনমুখী যান চলাচল বন্ধ ছিল। পরে জনভোগান্তির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে নির্ধারিত সময়ের আগেই কর্মসূচি শেষ করা হয়। একই দাবিতে বুধবার রাত ৭টায় মশাল মিছিলও অনুষ্ঠিত হয়।
এনসিটি ও চট্টগ্রাম কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে দেওয়ার বিরোধিতায় বিএনপি, জামায়াত, বামপন্থি এবং কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ-সমর্থিত বন্দরভিত্তিক শ্রমিক সংগঠনগুলোও বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছে।
আন্দোলনকারীদের মূল দাবি, চট্টগ্রাম বন্দরের টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব কোনো বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে দেওয়া উচিত নয়। বিএনপিপন্থি চট্টগ্রাম বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল, জামায়াত-সমর্থিত চট্টগ্রাম বন্দর ইসলামী শ্রমিক সংঘ এবং বামপন্থি শ্রমিক সংগঠনগুলো এ নিয়ে মাঠে রয়েছে। পাশাপাশি ব্যানার ছাড়াই আন্দোলনে অংশ নিচ্ছেন আওয়ামী লীগ-সমর্থিত বন্দর জাতীয় শ্রমিক লীগের অনেক নেতাকর্মী।
চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক ও চট্টগ্রাম বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের নেতা হুমায়ুন কবির বলেন, দলের পরিচয়ের চেয়ে দেশের ও বন্দরের স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দিয়েই তাঁরা আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন। বন্দরের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হলে প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে বলেও জানান তিনি।
জামায়াত-সমর্থিত চট্টগ্রাম বন্দর ইসলামী শ্রমিক সংঘের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ ইয়াছিন বলেন, এনসিটি-সিসিটি বিদেশি অপারেটরের হাতে দেওয়ার বিরোধিতায় তাঁদের সংগঠনও আন্দোলনে রয়েছে। তবে চুক্তি হলে পরবর্তী কর্মসূচি সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে জানানো হবে। বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ চুক্তি হলে বন্দর কার্যক্রম বন্ধের ঘোষণা দিলেও তাঁদের সংগঠন এখনো এমন সিদ্ধান্ত নেয়নি।
বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের (টিইউসি) চট্টগ্রাম সভাপতি ও বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের নেতা তপন দত্ত বলেন, শ্রমিকদের স্বার্থের জায়গায় বিভিন্ন সংগঠনের মধ্যে ঐক্য রয়েছে। জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলসহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতাকর্মীরা একই দাবিতে আন্দোলন করছেন।
সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি) কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, পিপিপির আওতায় বেসরকারি টার্মিনাল অপারেটরের মাধ্যমে এনসিটি ও ওসিওয়াই পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ প্রকল্পটি ২০২৩ সালের ২৩ মার্চ নীতিগত অনুমোদন পায়। প্রকল্পটির সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ২০৫ মিলিয়ন ডলার।
বিদেশি অপারেটর নিয়ে আপত্তি
এনসিটি ও সিসিটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে না দেওয়ার দাবিতে ইতোমধ্যে ধারাবাহিক কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ। সংগঠনটির নেতারা জানিয়েছেন, আগামী ১৩ অক্টোবর বন্দর ভবন ঘেরাও করা হবে। এর আগে একই দাবিতে মিছিল, সমাবেশ ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করা হয়েছে।
তবে চট্টগ্রাম বন্দরে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। সৌদি আরবভিত্তিক রেড সি গেটওয়ে টার্মিনাল পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনা করছে। পাশাপাশি ডেনমার্কের এপিএম টার্মিনালস লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনালের উন্নয়ন ও পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। সিসিটি পরিচালনার ক্ষেত্রেও সৌদি প্রতিষ্ঠানটিকে নিয়োগের প্রক্রিয়া এগিয়ে চলছে।
শ্রমিক নেতাদের অভিযোগ, বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ টার্মিনাল বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়া হলে দেশের রাজস্ব ও অর্থনৈতিক স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তবে সরকারের বক্তব্য, দক্ষতা বৃদ্ধি, নতুন বিনিয়োগ এবং আধুনিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতেই বিদেশি অপারেটর যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।