প্রখর রোদ, বৃষ্টির অনিশ্চয়তা আর পানির সংকট - বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষকদের কাছে এসব যেন চিরচেনা বাস্তবতা। তার ওপর ডিজেলের বাড়তি দাম আর সেচের ব্যয় অনেক সময় কেড়ে নেয় ফসল ফলানোর স্বস্তি। তবে সেই চিত্র বদলাতে শুরু করেছে সৌরশক্তিচালিত সেচ প্রযুক্তির হাত ধরে। সূর্যের আলোকে কাজে লাগিয়ে এখন জমিতে পৌঁছাচ্ছে পানি, কমছে উৎপাদন খরচ, আর কৃষকের মনে জাগছে স্বাবলম্বী হওয়ার নতুন প্রত্যাশা।
কৃষিতে এই পরিবর্তনকে আরও বিস্তৃত করতে রাজশাহী বিভাগে সরকারি উদ্যোগে সম্প্রসারণ করা হচ্ছে সৌর সেচব্যবস্থা। গত দুই বছরে বিভাগের আট জেলায় স্থাপন করা হয়েছে ৩২টি সোলার সেচ পাম্প। প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের দাবি, এতে উপকারভোগী কৃষকদের সেচ ব্যয় প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে, আর ফসলের নিবিড়তা বেড়েছে প্রায় ৫০ শতাংশ। রাজশাহী বিভাগ কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের যৌথ প্রচেষ্টায় এগিয়ে চলছে এই কার্যক্রম।
এই উদ্যোগে কৃষকদের চাহিদা অনুযায়ী ব্যবহার করা হচ্ছে তিন ধরনের সৌর সেচপ্রযুক্তি। নির্দিষ্ট জমিতে নিয়মিত পানি সরবরাহের জন্য স্থাপন করা হয়েছে ২৪টি ফিক্সড সোলার ইরিগেশন প্ল্যান্ট। পাশাপাশি এক জমি থেকে অন্য জমিতে সহজে সরিয়ে নেওয়ার সুবিধাসহ দেওয়া হয়েছে আটটি পোর্টেবল ইউনিট। আর ফলবাগানে পানির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে স্থাপন করা হয়েছে ১০টি প্রিসিশন সোলার ইরিগেশন ইউনিট। এসব প্রযুক্তির মাধ্যমে বিদ্যুৎ সংযোগ কিংবা ডিজেলের সরবরাহের ওপর নির্ভরতা ছাড়াই সেচের সুযোগ তৈরি হচ্ছে প্রত্যন্ত এলাকাতেও।
তবে শুধু সৌরশক্তি ব্যবহারই নয়, পানির প্রতিটি ফোঁটার সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করাও এই উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য। বিশেষ করে ফলবাগানে সৌরচালিত পাম্পের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে ড্রিপ ইরিগেশন বা ফোঁটা ফোঁটা সেচব্যবস্থা। পাইপের মাধ্যমে সরাসরি গাছের গোড়ায় পানি পৌঁছে দেওয়ায় কমছে অপচয়, বজায় থাকছে মাটির আর্দ্রতা, আর আগাছার প্রকোপও নিয়ন্ত্রণে থাকছে। দীর্ঘদিন ধরে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়ার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এমন পানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তিকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন কৃষিবিদরা।
প্রযুক্তির এই সুফল ইতোমধ্যে অনুভব করছেন মাঠপর্যায়ের কৃষকরাও। চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার কৃষক মো. আলমগীর হোসেন জানান, আগে ডিজেলচালিত পাম্পে সেচ দিতে গিয়ে উৎপাদন ব্যয়ের বড় অংশ চলে যেত জ্বালানির পেছনে। সেচের মৌসুমে ডিজেল পাওয়া নিয়েও দুশ্চিন্তায় থাকতে হতো। এখন সৌরশক্তির সহায়তায় বাগানে পানি দিতে পারছেন অনেক সহজে। এতে যেমন খরচ কমেছে, তেমনি পানির অপচয় কমিয়ে গাছের পরিচর্যাও হয়েছে স্বস্তিদায়ক। কৃষকের এই অভিজ্ঞতাই তুলে ধরছে মাঠপর্যায়ে প্রযুক্তিটির সম্ভাবনা।
কৃষি কর্মকর্তারাও দেখছেন আশাব্যঞ্জক পরিবর্তন। রাজশাহীর পবা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আব্দুল মান্নানের মতে, খরা ও পানি সংকটপ্রবণ এলাকায় সৌর সেচ কৃষকদের সক্ষমতা বাড়াতে কার্যকর ভূমিকা রাখছে। অন্যদিকে প্রকল্প পরিচালক কৃষিবিদ এস এম হাসানুজ্জামান জানিয়েছেন, সৌর পাম্প চালুর ফলে অনাবাদি ও পতিত জমিতেও বছরে তিনটি ধানসহ অন্যান্য ফসল উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এতে ফসলের নিবিড়তা বেড়েছে প্রায় ৫০ শতাংশ। যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ করা গেলে এসব পাম্প ২০ থেকে ২৫ বছর পর্যন্ত ব্যবহার করা সম্ভব বলেও আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সব মিলিয়ে বরেন্দ্র অঞ্চলে সৌরশক্তিনির্ভর সেচব্যবস্থা এখন কেবল খরচ কমানোর প্রযুক্তি নয়, বরং কৃষিকে আরও টেকসই করে তোলার একটি সম্ভাবনাময় পথ। একদিকে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমছে, অন্যদিকে পানি সাশ্রয় ও উৎপাদন বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হচ্ছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে এই সাফল্য ধরে রাখতে প্রয়োজন সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ, পানির পরিকল্পিত ব্যবহার এবং প্রযুক্তির কার্যকর সম্প্রসারণ। সূর্যের আলোকে কাজে লাগিয়ে কৃষির এই নতুন যাত্রা বরেন্দ্র অঞ্চলের মাঠে কতটা স্থায়ী সমৃদ্ধি নিয়ে আসে, এখন সেটিই দেখার অপেক্ষা।