মাঠজুড়ে সবুজের সমারোহ, আর সেই সবুজের বুকেই আগাম ফসল ঘরে তোলার স্বপ্ন বুনছেন মেহেরপুরের কৃষকরা। কেউ ব্যস্ত জমি তৈরিতে, কেউ রোপণ করছেন সবজির চারা, আবার কেউ পরিচর্যায় কাটাচ্ছেন ব্যস্ত সময়। শীতের আগমনী বার্তার সঙ্গে সঙ্গে জেলার কৃষিজমিতে বাড়ছে কর্মচাঞ্চল্য। ভালো ফলন আর লাভের আশায় এখন প্রতিটি দিনই গুরুত্বপূর্ণ কৃষকদের কাছে।

শুধু আগাম ফসল নয়, পুরো শীত মৌসুমে বাজারে সবজির সরবরাহ ধরে রাখতেও চলছে নানা প্রস্তুতি। কৃষি বিভাগ চলতি মৌসুমে জেলায় ৫ হাজার ২৫০ হেক্টর জমিতে শীতকালীন সবজি চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। ইতোমধ্যে প্রায় ২ হাজার হেক্টর জমিতে আগাম শাকসবজি আবাদ হয়েছে। পর্যায়ক্রমে জমিতে চারা রোপণের মাধ্যমে বিভিন্ন সময়ে ফসল বাজারজাত করার পরিকল্পনা কৃষকদের, যা উৎপাদনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সহায়ক হবে।

জেলার চকশ্যামনগর, গোভিপুর, বুড়িপোতা, শোলমারি ও কাথুলির মাঠ ঘুরে দেখা যায়, সকাল থেকেই কৃষকেরা নেমে পড়ছেন কাজে। কোথাও চলছে হালচাষ, কোথাও তৈরি হচ্ছে সবজি চাষের বেড, আবার কোথাও আগাছা পরিষ্কার ও সেচের প্রস্তুতি। বিকেল গড়ালে ব্যস্ততা বাড়ে বীজ বপন ও চারার পরিচর্যায়। ফুলকপি, বাঁধাকপি, টমেটো, বেগুন, মুলা, শিম, করলা, আলু ও নানা ধরনের শাকের আবাদ ঘিরে এখন সরগরম বিস্তীর্ণ মাঠ।

এই কর্মব্যস্ততার পেছনে রয়েছে পরিবারের সচ্ছলতা ফেরানোর প্রত্যাশা। সদর উপজেলার শোলমারি গ্রামের কৃষক সানোয়ার হোসেন এবার তিন বিঘা জমিতে আগাম ফুলকপি ও বাঁধাকপির চাষ করেছেন। তাঁর হিসাব অনুযায়ী, প্রতি বিঘা জমিতে জমি তৈরি, চারা রোপণ, পরিচর্যা, সেচ, সার ও কীটনাশক মিলিয়ে খরচ হচ্ছে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা। বৃষ্টির কারণে এবার সেচ খরচ কিছুটা কমেছে, ফলে ব্যয়ের চাপও সামান্য হ্রাস পেয়েছে। এখন অনুকূল বাজারদর পেলেই পরিশ্রমের সার্থকতা খুঁজে পাওয়ার আশা তাঁর।

তবে সবার পথ সমান মসৃণ নয়। মনোহরপুর গ্রামের কৃষক গোলাম মোস্তফার বীজতলা অতিবৃষ্টিতে দুই দফায় নষ্ট হয়েছে। নতুন করে তৈরি করা বীজতলার চারা রোপণের উপযোগী হওয়ায় এবার পাঁচ বিঘা জমিতে ফুলকপি, বাঁধাকপি ও ওলকপি চাষের প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি। প্রাকৃতিক প্রতিকূলতায় বারবার ক্ষতির মুখে পড়েও নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন এই কৃষক। কিন্তু চাষাবাদের বাড়তি খরচের সঙ্গে শ্রমিকের সংকট, মজুরি বৃদ্ধি ও সারের প্রাপ্যতা নিয়ে উদ্বেগ তাঁদের দুশ্চিন্তা বাড়াচ্ছে।

কৃষিকাজের এই ব্যস্ততা গ্রামীণ অর্থনীতিতেও তৈরি করছে নতুন গতি। জমি প্রস্তুত থেকে শুরু করে চারা রোপণ, আগাছা পরিষ্কার, সার প্রয়োগ ও কীটনাশক ছিটানো—প্রতিটি ধাপেই কাজ করছেন কৃষক পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি দিনমজুরেরা। এতে মৌসুমি কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে স্থানীয় পর্যায়ে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কাজী শাহনেওয়াজের মতে, দিনের রোদ আর রাতের শীতল আবহাওয়া আগাম সবজি চাষের জন্য সহায়ক। কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শও দেওয়া হচ্ছে, যাতে উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি তাঁরা আর্থিকভাবে লাভবান হতে পারেন।

সব মিলিয়ে মেহেরপুরের মাঠে এখন শীতকালীন সবজি ঘিরে নতুন সম্ভাবনার হাতছানি। আগাম ফসল বাজারে তুলে লাভের মুখ দেখার প্রত্যাশা যেমন রয়েছে, তেমনি পুরো মৌসুমে উৎপাদন ধরে রাখার চ্যালেঞ্জও আছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকা, সারের পর্যাপ্ত সরবরাহ এবং উৎপাদন খরচ নিয়ন্ত্রণে রাখা গেলে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সহজ হতে পারে। কৃষকদের ঘামঝরা পরিশ্রম আর মাঠভরা সবুজের এই আয়োজন শেষ পর্যন্ত কতটা স্বস্তি এনে দেয় তাঁদের সংসারে, এখন সেই অপেক্ষাতেই মেহেরপুরের কৃষিপাড়া।