২০২৬ সাল বিশ্বের প্রযুক্তি খাতের ধনকুবেরদের জন্য বড় সাফল্যের বছর হয়ে উঠেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ঘিরে ব্যবসার সম্প্রসারণ এবং প্রযুক্তি কোম্পানির শেয়ারের দাম বৃদ্ধির কারণে এ খাতের শীর্ষ ধনীদের সম্পদে বড় উল্লম্ফন দেখা গেছে।
ইকোনমিক টাইমসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ব্লুমবার্গ বিলিয়নিয়ারস ইনডেক্সে থাকা বিশ্বের ৫০০ শীর্ষ ধনীর মধ্যে প্রযুক্তি খাতের প্রায় ১০০ জনের সম্মিলিত সম্পদ চলতি বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বেড়েছে ৮৪৫ বিলিয়ন বা ৮৪ হাজার ৫০০ কোটি ডলার। বছরের প্রথম ৯ মাসে সম্পদ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে এটি নতুন রেকর্ড।
বর্তমানে প্রযুক্তি খাতের ধনকুবেরদের সম্মিলিত সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৪ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন বা ৪ লাখ ৬০ হাজার কোটি ডলার। ব্লুমবার্গের তালিকায় প্রযুক্তি খাতের ধনীরা মোট ধনীর প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হলেও সূচকভুক্ত মোট সম্পদের ৩৬ শতাংশই তাঁদের দখলে।
প্রযুক্তি খাতের বাইরে থাকা ধনীদের সম্পদ বৃদ্ধির সঙ্গে এ ব্যবধান আরও স্পষ্ট। একই সময়ে অন্যান্য খাতের ধনীদের সম্মিলিত সম্পদ বেড়েছে মাত্র ৬২ বিলিয়ন বা ৬ হাজার ২০০ কোটি ডলার। আর বিশ্বের ধনীদের মোট সম্পদ বৃদ্ধির ৯৪ শতাংশই এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের ধনীদের কাছ থেকে।
ব্লুমবার্গের হিসাবে, ১০ সেপ্টেম্বর থেকে বিশ্বের শীর্ষ ১০ ধনীর সবাই যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক। ২০১২ সালে ধনীদের সম্পদ হিসাব করা শুরু করার পর এই প্রথম এমন চিত্র দেখা গেল।
এই সম্পদ বৃদ্ধির বড় অংশই কেন্দ্রীভূত হয়েছে শীর্ষ কয়েকজন ধনীর হাতে। বিশ্বের শীর্ষ ধনী ইলন মাস্কের সম্পদ সেপ্টেম্বরের শেষ নাগাদ বেড়েছে ৩১০ বিলিয়ন বা ৩১ হাজার কোটি ডলার। ব্লুমবার্গের সূচকে ধনীদের মোট সম্পদ যতটা বেড়েছে, তার প্রায় ৪০ শতাংশই এসেছে মাস্কের সম্পদ বৃদ্ধির কারণে। সোমবার তিনি আবারও ট্রিলিয়নিয়ার হয়েছেন।
বিশ্বের ৫০০ শীর্ষ ধনীর সম্মিলিত সম্পদ জুনের মাঝামাঝি সর্বোচ্চ ১৩ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন বা ১৩ লাখ ৪০ হাজার কোটি ডলারে পৌঁছেছিল। পরে বিশ্ববাজারের অস্থিরতা এবং এআই খাতের কয়েকটি বড় কোম্পানির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ায় তা ৬ শতাংশ কমে ১২ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন বা ১২ লাখ ৬০ হাজার কোটি ডলারে নেমে আসে।
শীর্ষ ১০ ধনীর মধ্যে নয়জনই যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি খাতের সঙ্গে যুক্ত। ডেল টেকনোলজিসের প্রতিষ্ঠাতা মাইকেল ডেলের সম্পদ চলতি বছর ৮১ শতাংশ বেড়ে ২৫৪ বিলিয়ন বা ২৫ হাজার ৪০০ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। তাঁর কোম্পানির ডেটা সেন্টার ব্যবসার দ্রুত সম্প্রসারণ এর অন্যতম কারণ।
ফেসবুকের সহপ্রতিষ্ঠাতা মার্ক জাকারবার্গের সম্পদও এ বছর ২৩ বিলিয়ন বা ২ হাজার ৩০০ কোটি ডলার বেড়েছে। সেপ্টেম্বরে মেটা প্ল্যাটফর্মসের শেয়ারের দাম ২৭ শতাংশ বাড়ে, যা প্রায় চার বছরের মধ্যে কোম্পানিটির সবচেয়ে ভালো সময়গুলোর একটি। এআইভিত্তিক নতুন ব্যক্তিগত সহকারী ‘মিউজ’ চালুর পর মেটার শেয়ারে এই ঊর্ধ্বগতি দেখা যায়।
তবে এআই ব্যবসা সম্প্রসারণে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর বিপুল ঋণ নেওয়া নিয়ে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগও বাড়ছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ওরাকলের প্রতিষ্ঠাতা ল্যারি এলিসন অল্প সময়ের জন্য বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি হয়েছিলেন। সে সময় এক দিনেই তাঁর সম্পদ ৮৯ বিলিয়ন বা ৮ হাজার ৯০০ কোটি ডলার বেড়েছিল। এআই-সংশ্লিষ্ট ক্লাউড অবকাঠামো ব্যবসার দ্রুত প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসে ওরাকলের শেয়ারের দাম বেড়ে যাওয়াই এর কারণ ছিল।
তবে এক বছর পর এলিসনের সম্পদ কমেছে ১৯৬ বিলিয়ন বা ১৯ হাজার ৬০০ কোটি ডলার। একই সময়ে ওরাকলের ঋণ নিয়ে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ বেড়েছে এবং কোম্পানিটির ঋণখেলাপির বিরুদ্ধে সুরক্ষা নেওয়ার ব্যয় প্রায় রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে।
এআইয়ের উত্থানে শুধু বড় প্রযুক্তি কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা বা নির্বাহীরাই লাভবান হচ্ছেন না। এআই অবকাঠামো সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর উদ্যোক্তারাও দ্রুত ধনী হচ্ছেন। অ্যানথ্রপিকের মূল্যায়ন ৯৬৫ কোটি ডলারে পৌঁছানোর পর প্রতিষ্ঠানটির সাত সহপ্রতিষ্ঠাতা ব্লুমবার্গের ধনীদের তালিকায় যুক্ত হয়েছেন। চীনের ডিপসিক ও মিনিম্যাক্সের প্রতিষ্ঠাতারাও এআইয়ের উত্থানে সম্পদশালী হয়েছেন।
এআই পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় সার্ভার, চিপ ও ডেটা সেন্টারের সরঞ্জামের চাহিদা বাড়ায় তাইওয়ান ও চীনের প্রযুক্তি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিকেরাও লাভবান হচ্ছেন। স্যামসাংয়ের উত্তরাধিকারী পরিবার, টিএসএমসি ও মিডিয়াটেকের শীর্ষ ব্যক্তিরাও এ তালিকায় যুক্ত হয়েছেন।
অর্থাৎ এআইয়ের উত্থান শুধু প্রযুক্তি কোম্পানির শেয়ারমূল্যই বাড়াচ্ছে না; এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে পুরো প্রযুক্তি সরবরাহব্যবস্থায়। তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন ধনকুবেরও।