কক্সবাজারের সমুদ্র থেকে উঠে আসা একটি মাছ এখন জায়গা করে নিচ্ছে সুদূর যুক্তরাষ্ট্র, হংকং আর চীনের বাজারে। নাম পোপা। স্থানীয়ভাবে শুঁটকি হলেও বিদেশে এর কদর বেশ আলাদা - কখনো সুস্বাদু খাবারের উপকরণ, কখনো আবার মূল্যবান কাঁচামাল হিসেবে। তাই ছোট্ট এই মাছকে ঘিরেই তৈরি হয়েছে কোটি টাকার রপ্তানি বাণিজ্য।

এই বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র কক্সবাজারের নাজিরাটেক। দেশের সবচেয়ে বড় শুঁটকি উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত এই এলাকায় গড়ে উঠেছে প্রায় ৭০০টি মহাল। রোদে শুকিয়ে এখানে তৈরি হয় লাক্ষা, মাইট্যা, লইট্যা, কোরালসহ নানা মাছের শুঁটকি। তবে সবার ভিড়ে পোপা যেন একটু আলাদা - কারণ এর উৎপাদন পদ্ধতি, সংরক্ষণ আর মান নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বিশেষ নিয়ম।

আর সেই বিশেষ প্রক্রিয়ার দৃশ্য দেখা যায় উত্তর নুনিয়াছটার রপ্তানিমুখী কারখানাগুলোতে। সমুদ্র থেকে আসা পোপা প্রথমে পরিষ্কার করে পেটের ভেতর লবণ দেওয়া হয়, এরপর চলে ধোয়া-মোছা আর পরিচর্যা। তারপর বাঁশের মাচায় রোদে শুকিয়ে তৈরি হয় রপ্তানিযোগ্য শুঁটকি। বিদেশি ক্রেতারাও সরাসরি কারখানায় এসে এর মান যাচাই করেন। সামান্য ত্রুটিতেও বাতিল হতে পারে পুরো পণ্য।

এমন কঠোর মান নিয়ন্ত্রণের কারণও আছে। পোপা শুঁটকি দিয়ে বিদেশে তৈরি হয় বিভিন্ন ধরনের স্যুপ ও খাবার। শুধু শুঁটকিই নয়, পোপা মাছের শুকনো বায়ুথলি বা পটকা এবং আঁইশ থেকেও তৈরি হয় কোলাজেন, যার ব্যবহার রয়েছে প্রসাধনী ও ওষুধশিল্পে। অর্থাৎ কক্সবাজারের এই শুঁটকির চাহিদা শুধু খাবারের টেবিলে সীমাবদ্ধ নয়, ছড়িয়ে আছে শিল্পের নানা ক্ষেত্রেও।

চাহিদার সেই প্রতিফলন দেখা যায় রপ্তানির পরিসরেও। গত বছর একটি কারখানা থেকেই প্রায় ৭০ মেট্রিক টন পোপা শুঁটকি, যার মূল্য প্রায় ৬ কোটি টাকা, যুক্তরাষ্ট্র, হংকং ও চীনে পাঠানো হয়েছে। চলতি বছর লক্ষ্য প্রায় ৮০ মেট্রিক টন। আর এই রপ্তানি ঘিরে কারখানার শ্রমিক থেকে শুরু করে গভীর সমুদ্রের জেলে - অনেকের জীবিকার চাকা ঘুরছে।

কিন্তু কোটি টাকার এই বাণিজ্যের সামনে এখন বড় এক শঙ্কা। সমুদ্রে আগের তুলনায় পোপা মাছের দেখা মিলছে কম। জেলেদের ভাষ্য, মাছ ধরতে উপকূল থেকে ৬০-৭০ কিলোমিটার দূরের গভীর সমুদ্রে যেতে হচ্ছে। দীর্ঘ সাত-আট দিন সাগরে থেকেও আগের মতো মাছ মিলছে না। ফলে রপ্তানির চাহিদা থাকলেও সরবরাহ ধরে রাখা নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।

জেলেদের অভিযোগ, গভীর সমুদ্রে বড় ট্রলিং জাহাজের নির্বিচার মাছ আহরণও সংকটকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। জাল টেনে সাগরতলের নানা প্রজাতির মাছ একসঙ্গে তুলে নেওয়ায় ছোট কাঠের ট্রলারগুলো প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে। মৎস্য বিভাগ অবশ্য নিষিদ্ধ জালবিরোধী অভিযান চালানোর কথা জানিয়েছে। কিন্তু আধুনিক নজরদারি ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাও রয়েছে।

তাই কক্সবাজারের পোপা শুঁটকির গল্পটি শুধু বিদেশে রপ্তানি আর কোটি টাকার হিসাবের গল্প নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সমুদ্রের জীববৈচিত্র্য, জেলেদের জীবিকা আর দেশের রপ্তানি সম্ভাবনা। আজ যে পোপা শুঁটকি বিদেশের বাজারে কদর পাচ্ছে, সেই চাহিদা টিকিয়ে রাখতে হলে সমুদ্রের মাছের মজুতও টিকিয়ে রাখা জরুরি। নইলে রোদে শুকানো কোটি টাকার এই সম্ভাবনার আড়ালেই হয়তো একদিন দেখা দেবে মাছশূন্য সাগরের বাস্তবতা