গ্রাহক সুরক্ষা ও ক্ষুদ্রঋণ খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির (এমআরএ) ক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ জন্য দুই দশক পুরোনো এমআরএ আইন সংশোধনের কাজ চলছে। ইতিমধ্যে একটি খসড়া তৈরি করেছে সংস্থাটি। এতে কোনো ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের পুরো পরিচালনা পর্ষদ বাতিল করে সর্বোচ্চ এক বছরের জন্য প্রশাসক নিয়োগের ক্ষমতা চাওয়া হয়েছে।

খসড়ার প্রস্তাব অনুযায়ী, কোনো প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদ বাতিল করা হলে প্রথমে ছয় মাসের জন্য প্রশাসক নিয়োগ করতে পারবে এমআরএ। প্রয়োজন হলে তাঁর মেয়াদ আরও ছয় মাস বাড়ানো যাবে। পাশাপাশি ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) নিয়োগ ও পুনর্নিয়োগের ক্ষেত্রেও এমআরএর অনাপত্তির বিধান রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।

আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক প্রথম আলোকে বলেন, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে পূর্ণাঙ্গ খসড়া পাঠাতে এমআরএকে বলা হয়েছে।

পর্ষদ বাতিলের ক্ষমতা কেন চায় এমআরএ

বর্তমান আইনে কোনো ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে অপসারণের সুযোগ থাকলেও পুরো পরিচালনা পর্ষদ বাতিল করে প্রশাসক নিয়োগের একক ক্ষমতা এমআরএর নেই। নতুন আইনে এই ক্ষমতা যুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

এমআরএর এক্সিকিউটিভ ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হেলালউদ্দিন বলেন, এমআরএ আইন প্রণয়ন ও সংস্থাটি গঠনের পর প্রায় দুই দশক পেরিয়ে গেছে। এ সময়ে এনজিও ও ক্ষুদ্রঋণ খাতে অনেক পরিবর্তন এসেছে। খাতটিকে আরও শৃঙ্খলার মধ্যে আনতেই আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, মাঠপর্যায়ের কর্মী ও শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বেতন-বৈষম্য, কর্মীদের অতিরিক্ত কাজ করানো এবং শীর্ষ কর্মকর্তাদের অতিরিক্ত বেতনসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়েও সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে। তাঁর মতে, এসব পরিবর্তন এ খাতের স্বার্থেই করা দরকার।

এমআরএর যুক্তি, কোনো প্রতিষ্ঠানের পুরো পরিচালনা পর্ষদই যদি বড় ধরনের অনিয়ম বা অব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িত থাকে, সে ক্ষেত্রে শুধু একজন বা দুজনকে সরিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব নাও হতে পারে। তাই প্রয়োজন হলে পুরো পর্ষদ বাতিল করে প্রশাসক নিয়োগের ক্ষমতা প্রয়োজন।

খসড়া নিয়ে আপত্তি ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোর

তবে এমআরএর প্রস্তাব নিয়ে আপত্তি রয়েছে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোর নেটওয়ার্কিং সংস্থা ক্রেডিট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফোরামের (সিডিএফ)। সংগঠনটির অধীনে রয়েছে ১২৯টি ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান।

জানা গেছে, প্রায় তিন মাস আগে এমআরএ আইনের সংশোধিত খসড়াটি সিডিএফকে দেওয়া হয়। এরপর গত ১১ আগস্ট ঢাকার আগারগাঁওয়ে এমআরএর কার্যালয়ে এ বিষয়ে বৈঠক হয়। খসড়ার কিছু বিষয়ে একমত হলেও বেশ কিছু প্রস্তাবে দ্বিমত জানিয়েছে সিডিএফ। এ নিয়ে আরও বৈঠকের কথা রয়েছে।

সিডিএফের চেয়ারম্যান মুর্শেদ আলম সরকার বলেন, খসড়াটি বিশ্লেষণ করে তাঁদের মনে হয়েছে, এটি সরকারের বিনিয়ন্ত্রণের উদ্যোগের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তাঁর ভাষ্য, ক্ষুদ্রঋণ খাতকে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আনা হলে এ খাতের কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

তাঁর দাবি, ব্যাংক ও বিমা খাতের বিভিন্ন সমস্যার বিপরীতে ক্ষুদ্রঋণ খাত তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থানে ছিল। তাই যথাযথভাবে না বুঝে নতুন করে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করলে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ বলেন, তাঁরা এমআরএর সঙ্গে কাজ করছেন এবং শিগগিরই এ বিষয়ে একটি যৌথ মতামত দেবেন। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারপারসন হোসেন জিল্লুর রহমান অবশ্য এ বিষয়ে আপাতত কোনো মন্তব্য করতে চাননি।

লাইসেন্স ও সিইও নিয়োগেও নতুন বিধান

বর্তমানে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলো কোম্পানি আইনসহ বিভিন্ন আইনের আওতায় নিবন্ধিত হয় এবং এমআরএ তাদের সনদ দেয়। নতুন আইনে সনদের পরিবর্তে ‘লাইসেন্স’ চালুর প্রস্তাব করা হয়েছে। লাইসেন্স পেতে প্রতিষ্ঠানগুলোকে নতুন করে সাধারণ পরিষদ ও পরিচালনা পর্ষদ গঠন করে এমআরএর কাছে জমা দিতে হবে। নির্ধারিত শর্ত পূরণ না হলে লাইসেন্স বাতিল করার সুযোগও থাকবে।

খসড়ায় ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের নামের শেষে ‘এমএফআই’ শব্দ যুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে। একই সঙ্গে সিইও নিয়োগের বর্তমান কাঠামোও বহাল রাখার কথা বলা হয়েছে। তবে পরিচালনা পর্ষদ সিইও নিয়োগ করলেও তার আগে এমআরএর কাছ থেকে অনাপত্তি নিতে হবে।

আইনের নাম পরিবর্তনেরও প্রস্তাব করেছে এমআরএ। সংস্থাটি নতুন নাম হিসেবে ‘বাংলাদেশ মাইক্রোফাইন্যান্স রেগুলেটরি অথরিটি আইন’ প্রস্তাব করেছে। অন্যদিকে সিডিএফের প্রস্তাব, নাম হওয়া উচিত ‘বাংলাদেশ মাইক্রোফাইন্যান্স ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড রেগুলেটরি অথরিটি আইন’।

টিএমএসএসের প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক হোসনে আরা বেগম মনে করেন, ক্ষুদ্রঋণ খাতকে ব্যাংক খাতের সঙ্গে এক করে দেখা ঠিক নয়। তাঁর মতে, এই খাত সরাসরি দরিদ্র মানুষের কাছে গিয়ে ঋণ দেয় ও তা আদায় করে। অতিরিক্ত আইনি কড়াকড়ি আরোপ করা হলে অনেক প্রতিষ্ঠান এ খাত থেকে সরে যেতে পারে।

ঋণ নেওয়ার সুযোগ, বাড়ছে শাস্তির বিধানও

নতুন খসড়ায় সরকারের অনুমতি নিয়ে দেশি-বিদেশি উৎস থেকে ঋণ নেওয়ার সুযোগ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। এ বিষয়ে সিডিএফ একমত। পাশাপাশি লাইসেন্সপ্রাপ্ত প্রতিটি ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানকে অলাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচনার প্রস্তাব রয়েছে। কোনো প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেলে তার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ গ্রাহকদের সামাজিক কল্যাণে ব্যবহারের বিধান রাখার কথাও বলা হয়েছে।

তবে সিডিএফের দাবি, বর্তমান আইনেই ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলো অলাভজনক হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে। ফলে নতুন করে এ বিধান যুক্ত করার প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে তাদের।

খসড়ায় ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর তথ্য দেওয়া, প্রতিষ্ঠানের অর্থ বা গ্রাহকের আমানত আত্মসাৎ কিংবা তছরুপকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচনার প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে ফৌজদারি শাস্তির পাশাপাশি তছরুপ করা অর্থ সুদসহ আদায়ের বিধান রাখার কথা বলা হয়েছে।

এমআরএর মতে, ক্ষুদ্রঋণে সাধারণত বন্ধক বা জামানত নেওয়া হয় না। ফলে ঋণের টাকা আদায়ে প্রতিষ্ঠানগুলোকে দীর্ঘমেয়াদি দেওয়ানি মামলা বা চেক প্রত্যাখ্যানের মামলার ওপর নির্ভর করতে হয়। নতুন আইনি কাঠামো কার্যকর হলে পাওনা আদায়ের প্রক্রিয়া সহজ হওয়ার পাশাপাশি গ্রাহকের হয়রানিও কমতে পারে।

সময় বদলেছে, তাই আইন সংশোধন দরকার: বিশেষজ্ঞ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগের সাবেক শিক্ষক ও ইনস্টিটিউট অব মাইক্রোফাইন্যান্সের সাবেক নির্বাহী পরিচালক এম এ বাকী খলীলীর মতে, সময়ের সঙ্গে ক্ষুদ্রঋণ খাতের ধরন বদলেছে। বিদেশি অনুদানের ওপর নির্ভরতা কমে এখন ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো সঞ্চয়ও নিচ্ছে; ভবিষ্যতে জনগণের কাছ থেকে আমানত নেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

তিনি মনে করেন, এখানেই গ্রাহক সুরক্ষার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। তাঁর মতে, গ্রামীণ আর্থিক বাজারে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোর বড় ভূমিকা রয়েছে। ফলে বড় কোনো প্রতিষ্ঠান ব্যর্থ হলে তার প্রভাব পুরো খাতের ওপর পড়তে পারে।

তাঁর মতে, সময়ের প্রয়োজনেই আইন সংশোধন করা দরকার। তবে এমনভাবে আইন তৈরি করা উচিত, যাতে অল্প সময়ের মধ্যে আবার বড় ধরনের সংশোধনের প্রয়োজন না হয়। এ জন্য ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি অন্যান্য সংশ্লিষ্ট অংশীজনের সঙ্গেও বিস্তৃত আলোচনা করা প্রয়োজন।