খুলনার বিস্তীর্ণ প্রান্তরজুড়ে এখন সবুজের সমারোহ। কোথাও দুলছে আমনের শিষ, কোথাও আবার সোনালি ধানের অপেক্ষায় কৃষকের ব্যস্ততা। অনুকূল আবহাওয়া, পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত আর খাল পুনঃখননের সুফলে চলতি মৌসুমে খুলনা অঞ্চলের চার জেলায় বেড়েছে রোপা আমনের আবাদ। ফলে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রাকেও ছাড়িয়ে গেছে চাষের পরিমাণ।
কৃষকের এই সাফল্যের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে জলাবদ্ধতা নিরসন। খাল পুনঃখননের ফলে নিচু জমিতে পানি নিষ্কাশনের পথ তৈরি হওয়ায় অনেক অনাবাদি জমিও এবার এসেছে চাষের আওতায়। তার সঙ্গে সময়মতো বৃষ্টি ও অনুকূল আবহাওয়া মিলিয়ে আমন আবাদে তৈরি হয়েছে স্বস্তির পরিবেশ। আর মাঠের এই ইতিবাচক চিত্রের প্রভাব পড়েছে কৃষকের মুখেও।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা ও নড়াইলে এবার আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল প্রায় ২ লাখ ৯৯ হাজার ৮৫৯ হেক্টর। এর বিপরীতে আবাদ হয়েছে প্রায় ২ লাখ ৯০ হাজার ১০ হেক্টর জমিতে। তবে দেওয়া পরিসংখ্যানের এই দুই অঙ্কের মধ্যে অসামঞ্জস্য রয়েছে - অন্যদিকে অধিদপ্তর এটিকে লক্ষ্যমাত্রার ১০০ দশমিক ১ শতাংশ অর্জন হিসেবে উল্লেখ করেছে। অর্থাৎ সরকারি হিসাব অনুযায়ী আমন আবাদে এসেছে প্রত্যাশার চেয়েও ইতিবাচক ফল।
শুধু আবাদ নয়, উৎপাদনের সম্ভাবনাও এবার আশাব্যঞ্জক। চার জেলা মিলিয়ে প্রায় ১২ লাখ ৮৫ হাজার ৪৬১ মেট্রিক টন ধান, যা থেকে প্রায় ৮ লাখ ৫৬ হাজার ৯৭৪ মেট্রিক টন চাল পাওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে সাতক্ষীরায় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি জমিতে আমন আবাদ হয়েছে - লক্ষ্য ছিল ৮৯ হাজার ১৫০ হেক্টর, আবাদ হয়েছে ৯০ হাজার ১৬০ হেক্টরে। নড়াইলেও লক্ষ্য ছাড়িয়ে আবাদ হয়েছে ৪৩ হাজার ৬৭৫ হেক্টরে।
অন্যদিকে খুলনা ও বাগেরহাটেও আমনের আবাদ হয়েছে বড় পরিসরে। খুলনায় ৮৭ হাজার ৪৬৯ হেক্টর এবং বাগেরহাটে ৬৮ হাজার ৭০৬ হেক্টর জমিতে চাষ হয়েছে। চার জেলার মাঠজুড়ে এখন কৃষকের ব্যস্ততা - কেউ আগাছা পরিষ্কার করছেন, কেউ জমির পরিচর্যায় ব্যস্ত। ভালো ফলনের প্রত্যাশায় তাই দিন গুনছেন তারা।
এই আশাবাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাজারদরের প্রত্যাশাও। কৃষকদের ধারণা, মৌসুমে মোটা আমন ধানের প্রতি মণ অর্থাৎ ৪০ কেজি ধান ১ হাজার ৩৫০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রি হতে পারে। পাশাপাশি উৎপাদন বাড়াতে চার জেলার ৭৫ হাজার ৪০০ কৃষককে ৬ কোটি টাকার বেশি প্রণোদনা দিয়েছে সরকার। ফলে ফলন ও ন্যায্যমূল্য - দুই দিকেই স্বস্তির আশা কৃষকের।
সব মিলিয়ে জলাবদ্ধতা কমা, অনুকূল প্রকৃতি, সরকারি সহায়তা আর কৃষকের নিরলস পরিশ্রম - এই চার সমীকরণে খুলনা অঞ্চলে আমনের মাঠে ফুটেছে সম্ভাবনার হাসি। এখন কৃষকের প্রত্যাশা, মাঠের এই সোনালি স্বপ্ন যেন ঘরে তোলার পরও অটুট থাকে; আর উৎপাদনের পাশাপাশি বাজারেও যেন তারা পান ধানের কাঙ্ক্ষিত দাম।