আজ ৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবস। তবে বাংলাদেশে এ দিনটি শুধু উদযাপনের নয়, বরং দীর্ঘদিনের পেশাগত মর্যাদা ও আর্থিক নিরাপত্তার দাবির কথাও মনে করিয়ে দেয়। বেতন-ভাতা বৃদ্ধি, চাকরি জাতীয়করণ, এমপিওভুক্তি, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও উৎসব ভাতাসহ নানা দাবিতে বছরের পর বছর রাজপথে আন্দোলন করছেন শিক্ষকরা।
গত দুই দশকে শিক্ষক আন্দোলন বড় পরিসরে শুরু হয় ২০০৬ সালের দিকে। সরকারি প্রাথমিক শিক্ষকদের বেতন বৈষম্য দূর করার পাশাপাশি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা চাকরি জাতীয়করণ এবং বেসরকারি মাধ্যমিক ও কলেজের শিক্ষকরা সরকারি বেতন কাঠামোর দাবি তোলেন।
২০১১ সালে বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা জাতীয়করণের দাবিতে শহীদ মিনারে অবস্থান নেন। একই সময়ে এমপিওবঞ্চিত শিক্ষক-কর্মচারীরাও সরকারি বেতন কাঠামোর আওতায় আসার দাবিতে আন্দোলন করেন। ২০১২ সালে বেসরকারি কলেজের শিক্ষকরা শিক্ষা জাতীয়করণ এবং বেতন, ভাতা, ইনক্রিমেন্ট ও পদোন্নতির বৈষম্য দূর করার দাবি জানান।
এরপর ২০১৩ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত এমপিওভুক্তি ও জাতীয়করণের দাবিতে বিভিন্ন সময় আন্দোলন, অবস্থান ও অনশন করেন শিক্ষকরা। ২০১৩ সালে দেশের ২৬ হাজারের বেশি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণের প্রক্রিয়া শুরু হলে এক লাখের বেশি শিক্ষক সরকারি বেতন কাঠামোর আওতায় আসেন। তবে মাধ্যমিক, কলেজ ও মাদ্রাসার বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের জাতীয়করণের দাবি অব্যাহত থাকে।
২০২০ সালে করোনার সময় বেসরকারি ও বিশেষ করে নন-এমপিও শিক্ষকদের আর্থিক সংকট আরও প্রকট হয়। এরপরও এমপিওভুক্তি, জাতীয়করণ, বেতন-ভাতা বৃদ্ধি এবং সরকারি-বেসরকারি বৈষম্য দূর করার দাবিতে আন্দোলন চলতে থাকে।
২০২৩ সালে বেসরকারি মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের দাবিতে বড় আন্দোলন হয়। ২০২৪ সালেও জাতীয়করণ, এমপিওভুক্তি ও বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার দাবিতে কর্মসূচি অব্যাহত থাকে।
২০২৫ সালে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের আন্দোলনের অন্যতম প্রধান দাবি ছিল বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও উৎসব ভাতা বৃদ্ধি। আন্দোলনের পর সরকার বাড়িভাড়া ভাতা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়। ২০২৫ সালের ১ নভেম্বর থেকে মূল বেতনের ৭ দশমিক ৫ শতাংশ এবং ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে মোট ১৫ শতাংশ বাড়িভাড়া দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। ন্যূনতম বাড়িভাড়া নির্ধারণ করা হয় ২ হাজার টাকা।
একই বছর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের ১০ম গ্রেড, উচ্চতর গ্রেডের জটিলতা নিরসন এবং শতভাগ বিভাগীয় পদোন্নতির দাবিতে আন্দোলন তীব্র হয়। নভেম্বরে কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে। পরে কর্মবিরতি ও ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচির কারণে বিভিন্ন স্থানে বার্ষিক পরীক্ষা ব্যাহত হয়। আলোচনার আশ্বাসে একপর্যায়ে কর্মসূচি স্থগিত করা হলেও ১০ম গ্রেডের দাবি বাস্তবায়িত হয়নি।
প্রাথমিক শিক্ষক দাবি বাস্তবায়ন পরিষদের আহ্বায়ক মাহবুবুর রহমান বলেন, দীর্ঘদিন ধরে পদোন্নতি না হওয়া ও গ্রেডসংক্রান্ত বঞ্চনাসহ নানা সমস্যার মধ্য দিয়ে শিক্ষকরা কাজ করছেন। শিক্ষকদের জীবনমান ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। ন্যায্য সুযোগ-সুবিধার পাশাপাশি পেশাগত মর্যাদাও নিশ্চিত করতে হবে।
নতুন পে-স্কেলেও মূল্যস্ফীতির চাপ
২০২৬ সালে অনুমোদিত নতুন জাতীয় বেতন স্কেলে ২০টি গ্রেড বহাল রেখে বিভিন্ন স্তরে মূল বেতন বাড়ানো হয়েছে। ২০তম গ্রেডের প্রারম্ভিক বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং ১ম গ্রেডের বেতন ৭৮ হাজার থেকে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা করা হয়েছে। ১৩তম ও ১০ম গ্রেডের প্রারম্ভিক বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে যথাক্রমে ২৪ হাজার ও ৩২ হাজার টাকা।
তবে মূল্যস্ফীতির কারণে বেতন বৃদ্ধির প্রকৃত সুফল নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে, চলতি বছরের আগস্টে দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ।
শিক্ষকদের মতে, বেতন বাড়লেও বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, সন্তানের পড়াশোনা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ব্যয় বেড়েছে। ফলে আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বেতনের পাশাপাশি ভাতাগুলোও জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা প্রয়োজন।
এমপিওভুক্ত শিক্ষা জাতীয়করণ প্রত্যাশী জোটের সদস্যসচিব অধ্যক্ষ দেলাওয়ার হোসেন আজীজী বলেন, এমপিওভুক্ত শিক্ষা জাতীয়করণই তাদের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা। ধাপে ধাপে হলেও জাতীয়করণ করা হলে শিক্ষক-কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা কমবে।