ডিম্বাশয়ের কোষ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গিয়ে তৈরি হতে পারে ডিম্বাশয়ের ক্যানসার। এসব অস্বাভাবিক কোষ দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে আশপাশের সুস্থ টিস্যুতে ছড়িয়ে পড়তে পারে। প্রাথমিক পর্যায়ে অনেক সময় এ রোগের স্পষ্ট কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। আবার উপসর্গ দেখা দিলেও সেগুলো সাধারণ কিছু শারীরিক সমস্যার মতো হওয়ায় রোগ শনাক্ত হতে দেরি হতে পারে।

নারীর প্রজনন ব্যবস্থায় জরায়ুর দুই পাশে একটি করে দুটি ডিম্বাশয় থাকে। আকারে প্রতিটি ডিম্বাশয় প্রায় একটি কাঠবাদামের মতো। ডিম্বাণু উৎপাদনের পাশাপাশি ডিম্বাশয় থেকে ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরন হরমোনও তৈরি হয়।

ডিম্বাশয়ের ক্যানসারের চিকিৎসা রোগের ধরন ও পর্যায়ের ওপর নির্ভর করে। সাধারণত অস্ত্রোপচার ও কেমোথেরাপি চিকিৎসার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিছু ক্ষেত্রে অন্যান্য চিকিৎসাও প্রয়োজন হতে পারে।

যেসব লক্ষণ দেখা দিতে পারে

ডিম্বাশয়ের ক্যানসারের উপসর্গ ব্যক্তি ও রোগের ধরন অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে। সম্ভাব্য লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে—

  • পেট ফাঁপা বা অস্বাভাবিকভাবে পেট ফুলে যাওয়া
  • অল্প খাবারেই পেট ভরে যাওয়ার অনুভূতি
  • অকারণে ওজন কমে যাওয়া
  • তলপেট বা শ্রোণী অঞ্চলে অস্বস্তি বা ব্যথা
  • অতিরিক্ত ক্লান্তি
  • পিঠে ব্যথা
  • মলত্যাগের অভ্যাসে পরিবর্তন, যেমন কোষ্ঠকাঠিন্য
  • ঘন ঘন প্রস্রাবের বেগ হওয়া

এসব উপসর্গ অন্য অনেক সাধারণ সমস্যার কারণেও হতে পারে। তবে কোনো উপসর্গ নতুনভাবে দেখা দিলে, দীর্ঘস্থায়ী হলে বা বারবার হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

কী কারণে হয়?

ডিম্বাশয়ের ক্যানসারের সঠিক কারণ সবসময় নির্দিষ্টভাবে জানা যায় না। তবে ডিম্বাশয়ের কোষে ডিএনএ পরিবর্তন বা মিউটেশন হলে অস্বাভাবিক কোষের অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধি শুরু হতে পারে। একপর্যায়ে এসব কোষ টিউমার তৈরি করতে পারে এবং আশপাশের টিস্যুতে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

ক্যানসার কোষ স্বাভাবিক কোষের মতো নিয়ম মেনে মারা যায় না। ফলে এগুলো জমতে জমতে টিউমার তৈরি করতে পারে এবং পরবর্তী সময়ে শরীরের অন্য অংশেও ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে।

ডিম্বাশয়ের ক্যানসারের প্রধান ধরন

কোন ধরনের কোষ থেকে ক্যানসার শুরু হয়েছে, তার ওপর ডিম্বাশয়ের ক্যানসারের ধরন নির্ভর করে। প্রধান ধরনগুলো হলো—

এপিথেলিয়াল ক্যানসার: এটি ডিম্বাশয়ের ক্যানসারের সবচেয়ে সাধারণ ধরন। এর মধ্যে সিরাস ও মিউসিনাস কারসিনোমাসহ বিভিন্ন উপধরন রয়েছে।

স্ট্রোমাল টিউমার: তুলনামূলকভাবে বিরল। অনেক ক্ষেত্রে রোগের প্রাথমিক পর্যায়েই এটি শনাক্ত হতে পারে।

জার্ম সেল টিউমার: এটিও বিরল এবং সাধারণত তুলনামূলক কম বয়সী নারীদের মধ্যে দেখা যায়।

কারা বেশি ঝুঁকিতে?

বয়স বাড়ার সঙ্গে ডিম্বাশয়ের ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়তে পারে। এ ছাড়া কিছু জিনগত ও পারিবারিক কারণও এ রোগের ঝুঁকি বাড়ায়।

বিশেষ করে BRCA1 ও BRCA2 জিনের কিছু পরিবর্তন ডিম্বাশয়ের পাশাপাশি স্তন ক্যানসারের ঝুঁকিও বাড়াতে পারে। পরিবারে ডিম্বাশয় বা স্তন ক্যানসারের ইতিহাস থাকলেও ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি হতে পারে।

এ ছাড়া অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা, মেনোপজের উপসর্গ নিয়ন্ত্রণে হরমোন প্রতিস্থাপন চিকিৎসা, এন্ডোমেট্রিওসিস এবং প্রজননসংক্রান্ত কিছু বিষয়ও ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।

ঝুঁকি কমানোর উপায়

ডিম্বাশয়ের ক্যানসার পুরোপুরি প্রতিরোধের নিশ্চিত কোনো উপায় নেই। তবে কিছু ক্ষেত্রে ঝুঁকি কমানো সম্ভব। গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু ধরনের জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি দীর্ঘমেয়াদে ডিম্বাশয়ের ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতে পারে। তবে এসব ওষুধেরও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ও অন্যান্য ঝুঁকি রয়েছে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এগুলো গ্রহণ করা উচিত নয়।

পরিবারে স্তন বা ডিম্বাশয়ের ক্যানসারের ইতিহাস থাকলে বিষয়টি চিকিৎসককে জানানো জরুরি। প্রয়োজন অনুযায়ী জেনেটিক কাউন্সেলিং ও জিনগত পরীক্ষা করা যেতে পারে।

কোনো জিনগত পরিবর্তনের কারণে ক্যানসারের ঝুঁকি বেশি বলে শনাক্ত হলে চিকিৎসক ঝুঁকি কমানোর বিভিন্ন পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করতে পারেন। কিছু ক্ষেত্রে প্রতিরোধমূলক অস্ত্রোপচারের বিষয়টিও বিবেচনা করা হয়।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ডিম্বাশয়ের ক্যানসারের লক্ষণ অনেক সময় সাধারণ শারীরিক সমস্যার মতো হওয়ায় সেগুলো দীর্ঘদিন অবহেলা না করা। নতুন বা স্থায়ী কোনো উপসর্গ দেখা দিলে কারণ নিশ্চিত করতে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।