দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় ওটস, কাঁচা সালাদ কিংবা অঙ্কুরিত শস্যের (স্প্রাউটস) মতো পুষ্টিকর উপাদান যুক্ত করাকে সুস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক মনে করা হয়। এসব খাবারে রয়েছে উচ্চমাত্রার ফাইবার (আঁশ), ভিটামিন, খনিজ ও জরুরি উপাদান, যা পরিপাকতন্ত্রকে সচল রাখতে সাহায্য করে। তবে অনেকের ক্ষেত্রেই এসব পুষ্টিকর খাবার খাওয়ার পর পেট ফাঁপা (ব্লটিং), পেটে টানটান ভাব বা অস্বস্তি দেখা দেয়।
চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়ার পর পেট ফাঁপার অর্থ এই নয় যে খাবারগুলো অস্বাস্থ্যকর বা ক্ষতিকর। বরং অতিরিক্ত ফাইবার গ্রহণ, খাওয়ার দ্রুততা এবং শরীরের পরিপাকতন্ত্র নির্দিষ্ট কিছু কার্বোহাইড্রেট কীভাবে হজম করছে— মূলত তার ওপরই নির্ভর করে এই শারীরিক অস্বস্তি।
হঠাৎ ফাইবার বৃদ্ধি ও পেট ফাঁপার বিজ্ঞান স্বাস্থ্যের জন্য ফাইবার অত্যন্ত প্রয়োজনীয় হলেও হঠাৎ করে খাদ্যতালিকায় ফাইবারের পরিমাণ বাড়ালে সমস্যা তৈরি হতে পারে। ‘ক্লিনিক্যাল অ্যান্ড ট্রান্সলেশনাল গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি’ জার্নালে প্রকাশিত গবেষণা অনুযায়ী, পরিপাকতন্ত্র অভ্যস্ত হওয়ার আগেই হঠাৎ অতিরিক্ত ফাইবার খেলে অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়া সেগুলো দ্রুত গাঁজিয়ে (ফারমেন্টেশন) ফেলে। এই প্রক্রিয়ায় পেটে অতিরিক্ত গ্যাস তৈরি হয় এবং পেট ফাঁপার অনুভূতি সৃষ্টি হয়।
কম ফাইবারযুক্ত খাবার থেকে হঠাৎ ওটস, শাক-সবজি, অঙ্কুরিত বীজ বা গোটা শস্য বেশি খাওয়া শুরু করলে পরিপাকতন্ত্রের মানিয়ে নিতে কিছুটা সময় লাগে। এ ছাড়া উদ্ভিজ্জ খাবারে থাকা নির্দিষ্ট কিছু কার্বোহাইড্রেট ক্ষুদ্রান্ত্রে পুরোপুরি না শোষিত হয়ে বৃহদন্ত্রে চলে যায়, যেখানে ব্যাকটেরিয়া সেগুলোকে ভেঙে গ্যাসে পরিণত করে।
অঙ্কুরিত শস্যে কেন গ্যাস তৈরি হয়? পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ অঙ্কুরিত শস্যে প্রচুর প্রোটিন ও ফাইবার থাকে। তবে ‘জার্নাল অফ ফাংশনাল ফুডস’-এ প্রকাশিত গবেষণা জানাচ্ছে, এতে থাকা গাঁজনযোগ্য কার্বোহাইড্রেট অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়ার মাধ্যমে ভেঙে গ্যাসে রূপান্তরিত হয়। বিশেষ করে কাঁচা অঙ্কুরিত শস্যের চেয়ে সেদ্ধ বা রান্না করা শস্য হজম করা অনেক সহজ। তাই কাঁচা অবস্থায় না খেয়ে সামান্য সেদ্ধ করে খেলে হজমের অস্বস্তি অনেকটাই কমে।
সালাদ ও ওটস খাওয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতা
-
কাঁচা সালাদ: সালাদে ব্যবহৃত বাঁধাকপি, পেঁয়াজ, ফুলকপি, ব্রকলি এবং বিভিন্ন শিমে প্রচুর গাঁজনযোগ্য কার্বোহাইড্রেট থাকে। তা ছাড়া কাঁচা সবজি সেদ্ধ সবজির চেয়ে ধীরে হজম হয়। একবারে এক বাটি কাঁচা সালাদ খেলে পেটে ফাইবারের চাপ হঠাৎ বেড়ে যায়।
-
ওটস ও বিটা-গ্লুকান: ওটসে থাকা দ্রবণীয় ফাইবার ‘বিটা-গ্লুকান’ রক্তে কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ ও হজমে সহায়তা করে। কিন্তু ওটসের ফাইবার প্রচুর পানি শোষণ করে খাদ্যবস্তুর পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়, যা অভ্যস্ত নয় এমন পরিপাকনালীতে সাময়িক পেট ফাঁপা তৈরি করতে পারে।
একসাথে অতিরিক্ত ফাইবার ও খাওয়ার ভুল অভ্যাস ‘ব্রিটিশ নিউট্রিশন ফাউন্ডেশন’-এর মতে, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩০ গ্রাম ফাইবার খাওয়া লক্ষ্য হওয়া উচিত। কিন্তু সকালে ওটস, দুপুরে সালাদ, বিকেলে ফল এবং রাতে শস্য খেলে এক দিনেই ফাইবারের মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেড়ে যেতে পারে।
এ ছাড়া দ্রুত খাবার খাওয়া, খাবার চিবানোর সময় কথা বলা, ফিজি বা সোডাজাতীয় ড্রিঙ্কস পান করা এবং একসঙ্গে অনেক বেশি খাবার খেলেও পেটে বাতাস ঢুকে পেট ফাঁপতে পারে। আবার ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম (IBS) বা সংবেদনশীল পরিপাকতন্ত্রের ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও এই উপসর্গগুলো বেশি দেখা যায়।
প্রতিকার ও করণীয় স্বাস্থ্যকর এসব খাবার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। কিছু সাধারণ কৌশল মেনে চললেই এই সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব:
১. ধীরে ধীরে পরিমাণ বাড়ান: হঠাৎ অনেক বেশি না খেয়ে অল্প দিয়ে শুরু করুন এবং ধীরে ধীরে ফাইবারের পরিমাণ বাড়ান, যাতে অন্ত্রের মাইক্রোবায়োম মানিয়ে নিতে পারে। ২. পর্যাপ্ত পানি পান: ফাইবার গ্রহণের পাশাপাশি প্রচুর পানি পান করা অত্যন্ত জরুরি। ৩. রান্না করে খান: কাঁচা সালাদ বা অঙ্কুরিত শস্য পুরোপুরি কাঁচা না খেয়ে হালকা সেদ্ধ বা রান্না করে গ্রহণ করুন। ৪. ধীরে ও চিবিয়ে খান: খাবার সবসময় সময় নিয়ে ভালোভাবে চিবিয়ে খাওয়া উচিত।