ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো প্রবাসী এবং দেশের অভ্যন্তরে নির্বাচনি দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পোস্টাল ভোটিংয়ের আওতায় এনেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। বাংলাদেশে তৈরি প্রযুক্তিভিত্তিক এই ভোটিং ব্যবস্থা এবার গ্রহণ করতে আগ্রহ দেখাচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার দুই দেশ নেপাল ও শ্রীলঙ্কা।

ইসি কর্মকর্তারা জানান, ‘আইটি সাপোর্টেড পোস্টাল ভোটিং সিস্টেম’ সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি। এ ব্যবস্থার অভিজ্ঞতা ও প্রযুক্তি অন্য দেশ গ্রহণ করলে কারিগরি ত্রুটির টেকসই সমাধান সহজ হবে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রযুক্তিটির গ্রহণযোগ্যতাও বাড়বে।

ইসির ‘আউট অব কান্ট্রি ভোটিং সিস্টেম অ্যান্ড ইমপ্লিমেন্টেশন’ (ওসিভি-এসডিআই) প্রকল্পের টিম লিডার সালীম আহমাদ খান বলেন, ‘পোস্টাল ভোটিং ব্যবস্থা বিশ্বজুড়ে এক অনন্য উদ্ভাবন। পুরোপুরি বাংলাদেশে তৈরি এই ব্যবস্থার বৈশ্বিক গুরুত্ব অনেক। নেপালের প্রতিনিধিদল স্বউদ্যোগে এসেছে এবং তারা এ বিষয়ে অত্যন্ত ইতিবাচক। শুধু নেপাল নয়, গত সেপ্টেম্বরে শ্রীলঙ্কা সফরকালেও আমরা তাদের আগ্রহ দেখেছি। দেশের তৈরি এমন একটি প্রযুক্তি বিদেশে সমাদৃত হওয়া প্রতিটি বাংলাদেশির জন্য গর্বের।’

তিনি আরও বলেন, জাতীয় নির্বাচন ও উপনির্বাচনে পাওয়া অভিজ্ঞতার আলোকে বিদ্যমান সমস্যাগুলোর সমাধান করে সামনে এগিয়ে যেতে হবে। এটি নির্বাচন কমিশনের একটি বড় সম্পদ, যা ভবিষ্যতে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগানো প্রয়োজন।

বাংলাদেশের পোস্টাল ভোটিং ব্যবস্থা সম্পর্কে অভিজ্ঞতা নিতে আসা নেপালের নির্বাচন কমিশনার ড. রাজিব সুব্বা বলেন, ‘গ্লোবাল সাউথ’ বা উন্নয়নশীল বিশ্বের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের এই মডেল অত্যন্ত সফল। বাংলাদেশ ও নেপালের মতো দেশ প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারে। বাংলাদেশ থেকে কারিগরি সহায়তা পেলে আমরা সম্মানিত বোধ করব।

নেপালের আগামী প্রাদেশিক নির্বাচনে প্রবাসীদের জন্য পোস্টাল ভোটিং চালুর পরিকল্পনার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক নাগরিক প্রবাসে থেকে রেমিট্যান্সের মাধ্যমে জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখেন। নেপালের পরিস্থিতিও একই রকম। তাই দেশের বাইরে থাকা নাগরিকদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে তারা ‘বাংলাদেশ মডেল’ গভীরভাবে বোঝার চেষ্টা করছেন।

ড. রাজিব সুব্বা আরও বলেন, বাংলাদেশ আগে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। ফলে নেপাল সম্ভাব্য ভুলগুলো এড়িয়ে দ্রুত কাজ এগিয়ে নিতে পারবে।

উপসাগরীয় অঞ্চলসহ বিভিন্ন দেশে কর্মরত নেপালি শ্রমিকদের ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারে অভ্যস্ত করতে ভোটার শিক্ষার ওপর জোর দেওয়ার কথা জানান তিনি। পাশাপাশি ডাকযোগে কাগজপত্র আদান-প্রদানে বিলম্ব, কাঠমান্ডুতে ব্যালট পৌঁছানোর সময় নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং সাইবার নিরাপত্তার ঝুঁকিও বিবেচনায় রাখছে দেশটি।

সফরের উদ্দেশ্য সম্পর্কে ড. রাজিব সুব্বা বলেন, ‘বাংলাদেশে আসার মূল লক্ষ্য হলো প্রযুক্তিভিত্তিক পোস্টাল ভোটিং প্রক্রিয়া সরাসরি দেখা ও জানা। বাংলাদেশ দলের সঙ্গে এটি আমাদের তৃতীয় দফা আলোচনা। আমরা পরবর্তী দেড় বছরের মধ্যে যেকোনো একটি প্রাদেশিক নির্বাচনে এ ব্যবস্থা চালু করতে চাই।’

তবে বাংলাদেশের মডেলটি হুবহু গ্রহণ করা হবে কি না, তা গবেষণার পর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানান তিনি। সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দল ও সরকারি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনার পরই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

বাংলাদেশের মডেলটির প্রশংসা করে নেপালের এই নির্বাচন কমিশনার বলেন, ভবিষ্যতে এটি সম্পূর্ণ অনলাইন ভোটিং ব্যবস্থায় রূপ নিতে পারে। এ প্রযুক্তির অন্যতম বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এর সফটওয়্যার, কোড ও নিয়ন্ত্রণ বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় থাকে। ফলে প্রযুক্তি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করতে হয় না।

ইসি সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশের কারিগরি সহায়তা ও অভিজ্ঞতা নিতে নেপাল নির্বাচন কমিশনের ছয় সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল বুধবার প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন, অন্য চার নির্বাচন কমিশনার এবং ইসির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করে।

বৃহস্পতিবার দ্বিতীয় দিনে নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহর নেতৃত্বে ইসির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে পোস্টাল ভোটিংয়ের কার্যক্রম ও কারিগরি বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন প্রতিনিধিদলের সদস্যরা।

প্রতিনিধিদলের অন্য সদস্যরা হলেন নেপালের নির্বাচন কমিশনার ড. জানকী কুমারী তুলাধর, সচিব কৃষ্ণ প্রসাদ কাপরী, সিনিয়র কম্পিউটার অফিসার অনুপ নৌপানে, ডেপুটি অ্যাটর্নি কমলা কাফলে এবং ইউএনডিপির প্রতিনিধি প্রভাত কুমার।

ইসির তথ্য অনুযায়ী, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ অ্যাপের মাধ্যমে নিবন্ধনকারী ১৫ লাখ ২৮ হাজার ১৩১ জন অনুমোদিত ভোটারের মধ্যে ভোট দিয়েছেন ১২ লাখ ২৪ হাজার ১৮৮ জন, যা মোট ভোটারের ৮০ দশমিক ১১ শতাংশ।

রিটার্নিং কর্মকর্তাদের কাছে পৌঁছেছে ১১ লাখ ৬৫ হাজার ৫৯২টি ভোট, যা নিবন্ধিত ভোটারের ৭৬ দশমিক ২৮ শতাংশ। এর মধ্যে বৈধ ভোট ছিল ১০ লাখ ৭৩ হাজার ৪৯৭টি, অর্থাৎ ৭০ দশমিক ২৫ শতাংশ।

প্রবাসীদের পাঠানো ৪ লাখ ৯৮ হাজার ২৬৬টি ব্যালটের মধ্যে ৪ লাখ ৯৮ হাজার ২০৫টি গ্রহণ করেন রিটার্নিং কর্মকর্তারা। অন্যদিকে, দেশের অভ্যন্তরে অবস্থানরত ভোটারদের কাছ থেকে তাঁরা গ্রহণ করেন ৬ লাখ ৬৭ হাজার ৩৮৮টি ভোট।