আমাদের প্রতিদিনের সুখ-দুঃখ, ভালোলাগা কিংবা কষ্ট—সবকিছুর সঙ্গেই যেন কোনো না কোনোভাবে জড়িয়ে আছে একটি নাম—এন্ড্রু কিশোর। যার কণ্ঠ শুনলে মনে হয়, গানটি কেবল গাওয়া হয়নি, বরং কোনো মানুষের অব্যক্ত মনের কথাকেই সুরের আলোয় ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। আজ ১৯৫৫ সালের এই বিশেষ দিনে রাজশাহীতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন বাংলা চলচ্চিত্রের প্লেব্যাক সম্রাট। ২০২০ সালের জুলাইয়ে তিনি শারীরিকভাকে আমাদের ছেড়ে চলে গেলেও, তাঁর সৃষ্টি করা সুরের সুবাস আজও প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে স্নিগ্ধতা ছড়াচ্ছে।

যে কণ্ঠ হয়ে উঠেছিল বাঙালির প্রাণের স্পন্দন

এন্ড্রু কিশোর মানেই ছিল সিনেমার পর্দায় এক ভিন্ন মাত্রার আবেগ। তিনি যখন গাইতেন, তখন মনে হতো গানটির চরিত্র নিজেই জীবন্ত হয়ে উঠেছে। নায়ক রাজ্জাক থেকে শুরু করে সালমান শাহ, শাকিল খান কিংবা শাকিব খান—সবার লিপ সিঙ্কেই তাঁর কণ্ঠ সমানভাবে মানিয়ে যেত। বিশেষ করে রোমান্টিক মেলোডি হোক কিংবা জীবনমুখী বা মর্মস্পর্শী গান, তাঁর মতো এত সহজে মানুষের মনে দাগ কাটতে আর কেউ পেরেছেন কি না সন্দেহ। তাঁর কণ্ঠে “হায়রে মানুষ রঙিন ফানুস” কিংবা “সবাই তো ভালোবাসা চায়”—এগুলো কেবল গান নয়, যেন একেকটি জীবনদর্শন।

রাজশাহী থেকে কোটি মানুষের হৃদয়ে

সংগীতের প্রতি ভালোবাসাই তাঁকে রাজশাহী থেকে টেনে এনেছিল ঢাকাই চলচ্চিত্রের সোনালী ভুবনে। আলম খানের মতো কিংবদন্তি সুরকারদের হাত ধরে চলচ্চিত্রে পা রাখার পর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে। একের পর এক সুপারহিট গান উপহার দিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন নির্মাতাদের প্রথম পছন্দ। একটানা চার দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলা চলচ্চিত্রের গানকে তিনি বিশ্বস্ততার সঙ্গে টিকিয়ে রেখেছিলেন নিজের কণ্ঠের জাদুতে। আটবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জনের মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে গুণীর মূল্যায়ন কখনো হারিয়ে যায় না।

চিরদিনের জন্য বেঁচে থাকা এক নাম

আজ তাঁর জন্মদিনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে প্রতিটি সাংস্কৃতিক অঙ্গনে মানুষ তাঁকে স্মরণ করছে গভীর ভালোবাসায়। তিনি আমাদের মাঝে সশরীরে নেই, কিন্তু প্রতিদিন এফএম রেডিওতে, ইউটিউবে কিংবা মানুষের মুঠোফোনে যখন তাঁর কোনো গান বেজে ওঠে, তখন মনে হয় তিনি আমাদের পাশেই আছেন। জন্মদিনে এই মহান সুরের জাদুকরের প্রতি রইল বিনম্র ও অন্তহীন শ্রদ্ধা। বাংলা গান যতদিন বেঁচে থাকবে, এন্ড্রু কিশোরের নাম ততদিন স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।