তিতাস গ্যাসক্ষেত্রে নতুন দুটি গ্যাসকূপ খননের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ জন্য ৫৯২ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। কূপ দুটি থেকে প্রতিদিন প্রায় ৩ কোটি ঘনফুট গ্যাস উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

বুধবার (৪ নভেম্বর) সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী ও জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত একনেকের ষষ্ঠ সভায় প্রকল্পটি অনুমোদন পায়। সভায় মোট ৫৮ হাজার ৮৮ কোটি ৯২ লাখ টাকা ব্যয়ে ১৩টি উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

অনুমোদিত প্রকল্পগুলোর মধ্যে ১১টি নতুন এবং দুটি সংশোধিত। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকারি তহবিল থেকে ৫০ হাজার ৪১ কোটি ২০ লাখ টাকা, সংস্থার নিজস্ব অর্থায়ন থেকে ৭৩ কোটি ৭ লাখ টাকা এবং প্রকল্প সহায়তা হিসেবে ৭ হাজার ৯৭৪ কোটি ৬৫ লাখ টাকা ব্যয় করা হবে।

সভা শেষে সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি।

তিতাসে নতুন দুটি কূপ খনন

তিতাস গ্যাসক্ষেত্রে তিতাস-৩২ ও তিতাস-৩৩ নামে দুটি অনুসন্ধান ও উন্নয়ন কূপ খনন করা হবে। ৫৯২ কোটি টাকা ব্যয়ের এ প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব পেয়েছে বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেড (বিজিএফসিএল)। ২০২৯ সালের সেপ্টেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রকল্পের মোট ব্যয়ের মধ্যে সরকারি তহবিল থেকে ৪১৪ কোটি ৪০ লাখ টাকা এবং কোম্পানির নিজস্ব অর্থায়ন থেকে ১৭৭ কোটি ৬০ লাখ টাকা দেওয়া হবে।

প্রকল্প প্রস্তাব অনুযায়ী, নতুন কূপ দুটি থেকে ১০ বছরে প্রায় ১০০ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস ও ৬০ হাজার ৪৪৪ ব্যারেল কনডেনসেট পাওয়া যেতে পারে। ভোক্তা পর্যায়ের দামে উৎপাদিত গ্যাসের সম্ভাব্য মূল্য ধরা হয়েছে ৬ হাজার ৫২৩ কোটি ৯৭ লাখ টাকা।

দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়াতে ২০৩১ সালের মধ্যে ১৫০টি এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে আরও ১৫০টি কূপ খননের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। এর অংশ হিসেবেই তিতাসের নতুন দুটি কূপকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।

২০১০ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে তিতাস ও বাখরাবাদ গ্যাসক্ষেত্রে পরিচালিত ত্রিমাত্রিক ভূকম্পন জরিপের তথ্য বিশ্লেষণ করে কূপ দুটি খননের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। চীনের ন্যাশনাল পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের প্রতিষ্ঠান বিজিপি ইনকরপোরেটেডের পর্যালোচনায় তিতাস এলাকায় নতুন কূপ খননের সম্ভাবনা উঠে আসে।

প্রকল্পের আওতায় বিদেশি ঠিকাদারের মাধ্যমে কূপ খনন, দেশি-বিদেশি পরামর্শক নিয়োগ এবং গ্যাস সংগ্রহের পাইপলাইন স্থাপন করা হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দেশের গ্যাস উৎপাদন বাড়ার পাশাপাশি এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা কমবে বলে আশা করছে পরিকল্পনা কমিশন।

অন্যান্য যেসব প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে

একনেকের সভায় স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের পাঁচটি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে বরেন্দ্র অঞ্চলে নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা উন্নয়নে ১ হাজার ২০৩ কোটি ৭৩ লাখ টাকার প্রকল্প রয়েছে।

এ ছাড়া বরিশাল সিটি করপোরেশনের খাল পুনঃখনন এবং নির্বাচিত পৌরসভাগুলোতে স্থানীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নে ৭৩০ কোটি ৬৬ লাখ টাকার প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে।

একই মন্ত্রণালয়ের অধীনে ৮৭ কোটি ৪০ লাখ টাকার জলবায়ু-সহনশীল নগর উন্নয়ন প্রকল্প, ২ হাজার ৫৬৫ কোটি ৫৯ লাখ টাকার সামাজিক অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প এবং ৩ হাজার ৯৫১ কোটি ৩৭ লাখ টাকা অতিরিক্ত ব্যয়ে গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ পুলিশের সক্ষমতা বাড়াতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে বিশেষায়িত ও অপারেশনাল যানবাহন কেনার দুটি প্রকল্পও অনুমোদন পেয়েছে।

অন্যদিকে, ঢাকা সেনানিবাসের মঈনুল রোড আবাসিক এলাকায় কর্মকর্তাদের জন্য ভবন নির্মাণে ১৭৭ কোটি ১৯ লাখ টাকা এবং রাজধানীর জিগাতলার গাবতলা কলোনিতে সরকারি কর্মচারীদের আবাসিক ভবন নির্মাণে ২০০ কোটি ১১ লাখ টাকা ব্যয়ের প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অধীনে দেশের পাঁচটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিউক্লিয়ার মেডিসিন অ্যান্ড অ্যালায়েড সায়েন্সেস ইনস্টিটিউট স্থাপনে ৫৩৫ কোটি ৫৪ লাখ টাকার প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে।

শিক্ষা খাতে ৪১ হাজার ৯০ কোটি ৪৮ লাখ টাকা ব্যয়ে পঞ্চম প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি (পিইডিপি-৫) অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া গ্রামীণ সড়কে ছোট সেতু ও কালভার্ট নির্মাণ প্রকল্পের তৃতীয় সংশোধনীতে ব্যয় বাড়ানো হয়েছে ৫২৩ কোটি ৩৪ লাখ টাকা।

পরিকল্পনামন্ত্রীর অনুমোদন পাওয়া আরও পাঁচ প্রকল্প

একনেক সভায় জানানো হয়, ৫০ কোটি টাকার কম ব্যয়ের আরও পাঁচটি প্রকল্প ইতোমধ্যে পরিকল্পনামন্ত্রী অনুমোদন দিয়েছেন।

প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে দিনাজপুরের জিয়া হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতালের চিকিৎসাসেবার আধুনিকায়ন, শিক্ষার্থীদের নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহার নিশ্চিত করা, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের সড়ক ও যান চলাচল ব্যবস্থার উন্নয়ন, ঢাকা কেন্দ্রীয় মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রের সম্প্রসারণ এবং গাজীপুর সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আধুনিক যানবাহন ও সরঞ্জাম কেনা।

সভায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা, প্রতিমন্ত্রী, পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিবেরা উপস্থিত ছিলেন।