বিল পরিশোধ থেকে শুরু করে পণ্যবাহী ট্রাকের বন্দরে প্রবেশ, কনটেইনার ডেলিভারি, জাহাজের ছাড়পত্র কিংবা নিলামে পণ্য বিক্রি—চট্টগ্রাম বন্দরের বিভিন্ন সেবায় কমছে কাগজের ব্যবহার ও সরাসরি দাপ্তরিক যোগাযোগ। এসব কার্যক্রমকে একটি সমন্বিত ডিজিটাল ব্যবস্থার আওতায় আনতে কাজ করছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরকে পুরোপুরি পেপারলেস ও স্মার্ট পোর্টে রূপান্তরের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
ইতোমধ্যে বন্দরের শতভাগ ভেসেল বিল অনলাইনে সম্পন্ন হচ্ছে। কনটেইনার ও কনসাইনি বিলও টার্মিনাল অপারেটিং সিস্টেমের (টিওএস) মাধ্যমে তৈরি ও আদায়ের সিদ্ধান্ত হয়েছে। পাশাপাশি ই-গেট পাস, গেট ইন-আউট, ভেসেল ই-এনওসি, অনলাইন কার্ট টিকিট এবং টাইম স্লট ব্যবস্থাপনাও ডিজিটাল করা হচ্ছে। ফলে পণ্য খালাসের বিভিন্ন ধাপে ম্যানুয়াল কার্যক্রম ধীরে ধীরে কমে আসবে।
বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নবনির্মিত ওয়ান স্টপ সার্ভিস সেন্টারে সোনালী ব্যাংক পিএলসির বুথ স্থাপন করা হচ্ছে। এ ছাড়া এপিআই ইন্টিগ্রেশনের মাধ্যমে যেকোনো সময় অনলাইনে বন্দরের মাশুল পরিশোধের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এতে ছুটির দিন ও অফিস সময়ের বাইরেও মাশুল পরিশোধ করা যাবে। ৭২ ঘণ্টার মধ্যে মাশুল পরিশোধ না হলে অটো পুল পেমেন্ট সিস্টেম চালুর সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে।
পণ্য খালাসের পরবর্তী কার্যক্রমও অনলাইনের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। টিওএসের মাধ্যমে স্পেশাল ডেলিভারি অ্যাসাইনমেন্ট অনুমোদন, এনবিআর ও কাস্টমসের এপিআই ব্যবহার করে অকশন ডেলিভারি এবং ব্রেকবাল্ক অপারেশন ডিজিটাল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বন্দরে যানজট কমাতেও ডিজিটাল ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। টিওএসের নতুন সংস্করণে ড্রপ টিকিট, পিকআপ টিকিট ও ইআইআর ই-গেট পাসের সঙ্গে যুক্ত করা হবে। এর মাধ্যমে কোন ট্রাক কখন বন্দরে প্রবেশ করবে এবং কী পণ্য নিয়ে বের হবে, তা আরও নিয়ন্ত্রিতভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি বে টার্মিনালে স্লটভিত্তিক ম্যাপিংয়ের মাধ্যমে পেমেন্টভিত্তিক ট্রাক পার্কিং টিকিটিং ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বন্দর সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম বলেন, বিভিন্ন সেবায় অটোমেশন ও ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ায় বন্দরের কার্যক্রমে দক্ষতা ও গতি বাড়ছে। এনসিটির কার্যক্রম হস্তান্তরের পর দক্ষতা ১২ থেকে ১৪ শতাংশ বেড়েছে। ‘সিপিএ স্কাই’ ও প্রি-অ্যারাইভাল প্রসেসের মতো ডিজিটাল ব্যবস্থাও বন্দরের কার্যক্রমে গতি আনতে ভূমিকা রাখছে বলে জানান তিনি।
সম্প্রতি চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সম্মেলনকক্ষে চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস. এম. মনিরুজ্জামানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায় এসব কার্যক্রমের অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হয়। সভায় বন্দর সেবাকে আরও ডিজিটাল করার পাশাপাশি যানজট কমানো, রাজস্ব আদায় দ্রুত করা এবং ব্যবহারকারীদের হয়রানি কমাতে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এর আগে জুলাইয়ে ডেলিভারি ডকুমেন্টেশনের প্রতিটি ধাপ টিওএসের মাধ্যমে ডিজিটাল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এতে ডেলিভারি অর্ডারের আবেদন থেকে চূড়ান্ত গেট আউট পর্যন্ত ম্যানুয়াল প্রক্রিয়া বাদ দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়। একই সঙ্গে টিওএসকে কাস্টমসের অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেমের সঙ্গে রিয়েল-টাইমে যুক্ত করা হয়েছে। ফলে কাস্টমস কোনো কনটেইনার আটকে দিলে সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমও স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্থগিত হবে।
বন্দর সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন ব্যবস্থায় একই কাজের জন্য ব্যবহারকারীদের একাধিক দপ্তর বা ডেস্কে যেতে হবে না। অনলাইনে কোনো নথি কোন পর্যায়ে রয়েছে, সেটিও জানা যাবে। এতে সময় ও খরচ কমার পাশাপাশি সেবার স্বচ্ছতা বাড়বে। একই সঙ্গে দ্রুত পণ্য খালাস, যানজট নিয়ন্ত্রণ ও বকেয়া মাশুল আদায়েও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
ইতোমধ্যে ‘পোর্ট সিঙ্গেল উইন্ডো’ চালুর মাধ্যমে চট্টগ্রাম বন্দর পূর্ণাঙ্গ স্মার্ট পোর্ট ও পেপারলেস ব্যবস্থার দিকে যাত্রা শুরু করেছে। এই প্ল্যাটফর্মে একটি লগইনের মাধ্যমে বিভিন্ন সেবা নেওয়া এবং জাহাজের গতিবিধি রিয়েল-টাইমে পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে।