ঢাকার আদালত চত্বর থেকে মাত্র ১২ দিনের ব্যবধানে পালিয়ে গেছেন কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি দুই আসামি। তাঁদের একজন শীর্ষ মাদক কারবারি পিচ্চি রাজা, অন্যজন হত্যা মামলার আসামি মো. শরিফুল ইসলাম (২৮)। পৃথক দুটি ঘটনায় আসামিদের পালিয়ে যাওয়ায় পুলিশের দায়িত্ব পালন ও আদালত চত্বরের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

গত ২৭ সেপ্টেম্বর ঢাকার তাঁতীবাজার মোড়ে প্রিজন ভ্যান থেকে পালিয়ে যান পিচ্চি রাজা। এর ১২ দিন পর গত ৬ অক্টোবর ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের এজলাস থেকে হাতকড়া খুলে পালিয়ে যান শরিফুল ইসলাম। দুজনকেই কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে আদালতে হাজির করার জন্য আনা হয়েছিল।

পিচ্চি রাজার পালানোর ঘটনায় সহযোগিতার অভিযোগে দুই পুলিশ সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্যদিকে, শরিফুলকে আদালতে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্বে থাকা কনস্টেবলকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ঘটনায় তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। পাশাপাশি পুলিশ বাদী হয়ে একটি মামলাও করেছে।

গত ৬ অক্টোবর দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে আদালতের এজলাস থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় হাতকড়া খুলে পালিয়ে যান শরিফুল। এ সময় তাঁর হাতে হাতকড়া ছিল এবং সঙ্গে কোর্ট পুলিশের সদস্যরাও ছিলেন। আদালতের বারান্দায় যাওয়ার পর কৌশলে হাতকড়া খুলে তিনি পালিয়ে যান বলে জানা গেছে।

ঘটনাটি পুলিশের দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ সামনে এনেছে। ওই দিন কোর্ট হাজতখানার দায়িত্বে থাকা পুলিশ কর্মকর্তা মোর্শেদ আলম বলেন, শরিফুলের হাতে হাতকড়া ঠিকভাবে লাগানো হয়নি। সঠিকভাবে হাতকড়া পরানো হলে সেটি কীভাবে খুলে ফেললেন, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। সিসিটিভি ফুটেজেও তাঁর হাতকড়া খোলার দৃশ্য দেখা গেছে বলে জানান তিনি।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) প্রসিকিউশন বিভাগের উপকমিশনার মহিউদ্দিন মাহমুদ সোহেল বলেন, আধুনিক হাতকড়া কিছুটা চিকন হলেও পুরোনো হাতকড়া তুলনামূলক মোটা ও শক্ত। তবে দুটি হাতকড়াই মজবুত এবং নির্দিষ্ট চাবি ছাড়া খোলা সম্ভব নয়। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, শরিফুল কৌশলে হাতকড়া খুলে পালিয়ে গেছেন।

এ ঘটনায় শরিফুলকে আদালতে নেওয়ার দায়িত্বে থাকা কনস্টেবলকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। পুলিশ বাদী হয়ে মামলাও করেছে বলে জানান ডিএমপির এই কর্মকর্তা।

সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, কিছু আসামির কবজি চিকন হওয়ায় হাতকড়া যথেষ্ট আঁটসাঁট করে না পরালে সেটি খুলে ফেলার সুযোগ তৈরি হতে পারে। আবার হাতকড়া পরানোর সময় ব্যথার অজুহাতে ঢিলা করে দেওয়ার অনুরোধ কিংবা কবজিতে তেল ব্যবহারের মতো কৌশল নেওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। তবে শরিফুলের ক্ষেত্রে এমন কিছু ঘটেছিল কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হতে হবে।

সূত্রটি আরও জানায়, আসামিদের হাতকড়া পরানোর পর পুলিশ সাধারণত টান দিয়ে পরীক্ষা করে দেখে, সেটি ঠিকভাবে আটকানো হয়েছে কি না। সে ক্ষেত্রে শরিফুল কীভাবে হাতকড়া খুলে পালিয়ে গেলেন, তা তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।

কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার সূত্রে জানা গেছে, খিলগাঁও থানার একটি হত্যা মামলা এবং কোতোয়ালি থানায় দণ্ডবিধির ২২৪ ধারায় করা মামলায় শরিফুল ইসলাম কাশিমপুর-২ কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি ছিলেন। মঙ্গলবার সকাল আনুমানিক ৬টা থেকে ৭টার মধ্যে পুলিশের এসকর্ট টিম প্রিজন ভ্যানে করে তাঁকে অন্য আসামিদের সঙ্গে পুরান ঢাকার আদালতে নিয়ে যায়।

শরিফুলের বিরুদ্ধে এর আগেও আদালত থেকে পালানোর অভিযোগ রয়েছে। ২০২৫ সালে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের হাজতখানায় নেওয়ার পথে পুলিশ সদস্যদের মারধর করে পালিয়ে যান তিনি। পরে কোতোয়ালি থানা পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে। এরপর কারাগারে পাঠানো হলেও এবার আদালতে হাজির করার সময় আবারও পালিয়ে যান তিনি।

কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এ কে এম রবিউল বলেন, কোর্ট পুলিশ আসামি পালিয়ে যাওয়ার বিষয়টি তাঁদের জানিয়েছে। খবর পাওয়ার পরই পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তারে তৎপরতা শুরু করেছে। এ ঘটনায় নতুন করে মামলা হয়েছে। এর আগেও শরিফুল আদালত চত্বর থেকে পালিয়ে গিয়েছিলেন এবং পরে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল বলে জানান তিনি।

শরিফুলের পালানোর কয়েক দিন আগে, গত ২৭ সেপ্টেম্বর ঢাকার তাঁতীবাজার মোড়ে পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সামনে প্রিজন ভ্যান থেকে পালিয়ে যান শীর্ষ মাদক কারবারি পিচ্চি রাজা। তাঁকেও কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে আদালতে নেওয়া হচ্ছিল।

পিচ্চি রাজার পালানোর ঘটনায় পুলিশের দায়িত্বে অবহেলা এবং আসামিকে পালাতে সহযোগিতা করার অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় তদন্তের পর দুই পুলিশ সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, পিচ্চি রাজার পালিয়ে যাওয়ার ঘটনাটি পরিকল্পিত ছিল বলে তদন্তে উঠে এসেছে। গাজীপুর থেকে পালানোর ঘটনা নিয়ে তদন্ত শুরু হলেও ঢাকার তাঁতীবাজার এলাকায় তাঁকে পালাতে সহযোগিতা করা হয়েছিল বলেও তথ্য পাওয়া গেছে।

তবে এ ঘটনায় দুই পুলিশ সদস্য গ্রেপ্তার হলেও পিচ্চি রাজাকে এখনো গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি।