একদিন যে জমিতে ফসল ফলিয়েও নিজের বলে দাবি করার সুযোগ ছিল না, আজ সেই জমির মালিক তিনি নিজেই। শৈশবের অপমান আর অভাবকে শক্তিতে পরিণত করে কৃষিতে সাফল্যের নতুন গল্প লিখেছেন বরিশালের বাবুগঞ্জের সুমন আহমেদ। বিদেশের মাটিতে রংমিস্ত্রির কাজ করে জমানো অর্থে কিনেছেন বাবার চাষ করা জমি, আর সেখানেই গড়ে তুলেছেন পেঁপে, সবজি ও মাছের সমন্বিত খামার। যে স্বপ্ন একসময় ছিল কেবল নিজের জমিতে চাষ করার, আজ তা রূপ নিয়েছে কোটি টাকার কৃষি উদ্যোগে।

সুমনের এই পথচলার শুরু অবশ্য কোনো সমৃদ্ধ খামার থেকে নয়, বরং এক তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে। সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় বাবার সঙ্গে বর্গা চাষের ডাল ভাগ করে জমির মালিকদের বাড়িতে পৌঁছে দিতে গিয়েছিলেন তিনি। একজন মালিক ডাল কম দেওয়ার অভিযোগ তুলে তাঁর বাবাকে অপমান করেন। ছোট্ট সুমনের মনে সেই ঘটনা গভীর দাগ কাটে। সেদিনই মনে মনে ঠিক করেছিলেন, একদিন নিজের জমিতে চাষ করবেন, আর সেই প্রতিজ্ঞাই হয়ে ওঠে তাঁর জীবনের লক্ষ্য।

অভাবের কারণে পড়াশোনা বেশি দূর এগোয়নি, পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে শুরু হয় সংগ্রাম। ঢাকায় কখনো নির্মাণশ্রমিকের সহকারী, কখনো শ্রমিক, আবার কখনো রংমিস্ত্রি হিসেবে কাজ করেছেন সুমন। ১৯৮২ সালে কুয়েতে একটি প্রতিষ্ঠানে রংমিস্ত্রির কাজ পাওয়ার পর খুলে যায় বিদেশে কাজের নতুন সুযোগ। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন দেশে কাজ করতে গিয়ে কৃষিকে দেখেছেন ভিন্ন দৃষ্টিতে। জার্মানি ও চীনের বড় খামারগুলোর সাফল্য তাঁকে বুঝিয়েছে, পরিকল্পনা আর আধুনিক পদ্ধতি কাজে লাগাতে পারলে কৃষিও হতে পারে লাভজনক ব্যবসা।

বিদেশে কাজের পাশাপাশি কৃষি সম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের চেষ্টাও চালিয়ে গেছেন তিনি। মালয় উপদ্বীপে বড় খামার ঘুরে ভারতীয় শাহি ও কাশ্মীরি জাতের পেঁপে চাষে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। সংগ্রহ করেন উন্নত জাতের বীজ, আর বিদেশে উপার্জিত অর্থ দিয়ে ধীরে ধীরে কিনতে থাকেন জমি। ২০১৯ সালে দেশে ফিরে ১২৩ শতক ও ৫০ শতক জমি মিলিয়ে ১৭৩ শতকের জায়গায় শুরু করেন সমন্বিত কৃষি খামার। পুকুর খনন, পেঁপের চারা রোপণ আর মাছ চাষের ছোট উদ্যোগই ধীরে ধীরে বড় সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেয়।

বর্তমানে সুমনের খামারে রয়েছে প্রায় ১ হাজার ৬০০ পেঁপেগাছ এবং তিনটি পুকুর। পাশাপাশি চাষ হচ্ছে বেগুন, ধুন্দুল ও মিষ্টিকুমড়া। এবারের পেঁপে বিক্রি থেকেই ১৭ লাখ টাকা আয় করেছেন তিনি, যেখানে অন্তত আট লাখ টাকা লাভের আশা করছেন। তবে খামারে থাকা আরও কিছু পেঁপে বিক্রি না করে দর্শনার্থীদের আপ্যায়নের জন্য রেখে দিয়েছেন। কিন্তু ফল বিক্রির চেয়েও বড় সম্ভাবনা দেখছেন চারা উৎপাদনে। চলতি বছর প্রায় ২০ লাখ পেঁপের চারা তৈরির লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছেন তিনি; ইতিমধ্যে ক্রয়াদেশ অনুযায়ী প্রস্তুত করেছেন সাড়ে চার লাখ চারা।

উন্নত জাতের এই চারার চাহিদা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে তাঁর আধুনিক সিডলিং হাউস। বিশেষ পলিথিনের ছাউনিতে তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ করে বীজের অঙ্কুরোদ্গম এবং চারার প্রাথমিক বৃদ্ধির উপযোগী পরিবেশ তৈরি করা হয়। ভারত থেকে সংগ্রহ করা বীজ ব্যবহার করে উৎপাদিত এসব চারা কিনতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে কৃষকেরা আসছেন সুমনের খামারে। তাঁর হিসাবে, এক কেজি বীজ থেকে প্রায় ২১ হাজার চারা উৎপাদন সম্ভব। প্রতিটি চারা ৪০ টাকায় বিক্রি করে দুই টাকা লাভ থাকে। ধারাবাহিক এই উদ্যোগে ২০২৩ সালের ছয় লাখ টাকার আয় ২০২৫ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৫ লাখ ৬০ হাজার টাকায়।

এবারের লক্ষ্য আরও বড়—পেঁপে, সবজি, মাছ ও চারা বিক্রি মিলিয়ে আয় কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রত্যাশা করছেন সুমন। তাঁর এই সাফল্য এখন শুধু ব্যক্তিগত অর্জন নয়, স্থানীয় কর্মসংস্থান ও কৃষি সম্প্রসারণেরও উদাহরণ। খামারে কাজ করছেন ১৫ জন শ্রমিক, যাঁদের মধ্যে ছয়জন নারী। তাঁদের একজনের ভাষায়, এখানে কাজ করেই পরিবারে এসেছে আর্থিক স্বস্তি। কৃষি কর্মকর্তারাও উন্নত মানের চারা উৎপাদন ও অন্য কৃষকদের সহায়তার জন্য তাঁর উদ্যোগের প্রশংসা করছেন। যে জমিতে একসময় বাবার অপমান সহ্য করতে হয়েছিল, সেই জমিতেই আজ সুমন গড়ে তুলেছেন আত্মমর্যাদা, কর্মসংস্থান আর সাফল্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত।