চাকরির পেছনে ছুটে নয়, নিজেদের ভাগ্য নিজেরাই গড়ার প্রত্যয়ে পথচলা শুরু তিন বন্ধুর। পুঁজি ছিল মাত্র ৫০ হাজার টাকা, আর সম্বল ছিল নতুন কিছু করার সাহস। সেই সামান্য বিনিয়োগেই মাশরুম চাষ শুরু করে এখন সাফল্যের মুখ দেখছেন মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলের তিন তরুণ। পশ্চিম ভাড়াউড়া গ্রামের এমদাদুল হক মিলন, সাখাওয়াত হোসেন ও মো. তানিম মিয়া প্রমাণ করছেন, বড় স্বপ্ন বাস্তবায়নে সব সময় বড় পুঁজির প্রয়োজন হয় না; দরকার সঠিক পরিকল্পনা আর উদ্যোগী মনোভাব।

তবে মাশরুম চাষে আসার আগে তাঁদের ভাবনায় ছিল গবাদিপশুর খামার গড়ে তোলার পরিকল্পনা। খোঁজখবর নিয়ে জানতে পারেন, সেই উদ্যোগ শুরু করতে প্রয়োজন হতে পারে ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা। এত অর্থের সংস্থান করা সম্ভব না হওয়ায় বিকল্প পথ খুঁজতে থাকেন তাঁরা। আর সেই খোঁজই তাঁদের নিয়ে আসে মাশরুম চাষের সম্ভাবনার কাছে। কম পুঁজিতে কৃষিভিত্তিক ব্যবসা গড়ে তোলার সুযোগ দেখে তিন বন্ধু সিদ্ধান্ত নেন, ছোট পরিসর থেকেই শুরু করবেন নিজেদের উদ্যোগ।

সিদ্ধান্তের পর আর দেরি করেননি তাঁরা। নিজেদের উদ্যোগেই তৈরি করেন মাশরুম চাষের উপযোগী পরিবেশ, মাত্র ২৭০ বর্গফুটের একটি ঘরকে সাজিয়ে তোলেন ছোট্ট খামারে। সেখানে চাষ করছেন অয়েস্টার মাশরুম। শ্রীমঙ্গলের উষ্ণ আবহাওয়ায় চাষের উপযুক্ত পরিবেশ ধরে রাখতে স্থাপন করেছেন এক্সহস্ট ফ্যান এবং স্বয়ংক্রিয় পানি ছিটানোর ব্যবস্থা। কারণ মাশরুম উৎপাদনে শুধু বীজ বা জায়গা থাকলেই চলে না, প্রয়োজন তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার সঠিক ভারসাম্য।

আর এই পরিবেশ নিয়ন্ত্রণই তাঁদের প্রতিদিনের কাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিশেষ করে গরমের সময় ঘরের ভেতর কাঙ্ক্ষিত তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা বজায় রাখা বেশ কঠিন হয়ে পড়ে। তাই নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হয় চাষের পরিবেশ, নজর রাখতে হয় উৎপাদনের প্রতিটি ধাপে। উদ্যোক্তাদের অভিজ্ঞতায়, শীত মৌসুমে তুলনামূলক ভালো ফলন পাওয়া যায়। অর্থাৎ, সীমিত জায়গায় মাশরুম চাষ সম্ভব হলেও কাঙ্ক্ষিত ফলন পেতে প্রয়োজন যত্ন, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং নিয়ম মেনে পরিচর্যা।

এই পরিশ্রমের পেছনে রয়েছে নিজেদের পায়ে দাঁড়ানোর দৃঢ় প্রত্যয়। উদ্যোক্তা এমদাদুল হক মিলনের ভাষায়, চাকরির অপেক্ষায় সময় ব্যয় না করে নিজেদের কিছু করার চিন্তা থেকেই তাঁরা মাশরুম চাষে নেমেছেন। শুরুতে লক্ষ্য ছিল স্বাবলম্বী হওয়া, আর এখন স্বপ্ন আরও বড়। উৎপাদন ও বাজারজাতকরণে অভিজ্ঞতা বাড়িয়ে খামারের পরিসর সম্প্রসারণ করতে চান তাঁরা। ভবিষ্যতে নিজেদের সাফল্যের পাশাপাশি অন্য তরুণদের জন্যও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করার প্রত্যাশা তাঁদের।

তিন বন্ধুর এই উদ্যোগ ইতোমধ্যে স্থানীয়দের মধ্যেও আশার সঞ্চার করেছে। পশ্চিম ভাড়াউড়া গ্রামের বাসিন্দা জমির আলীর মতে, চাকরির পেছনে না ছুটে তরুণদের এমন উদ্যোগ নেওয়া অন্যদেরও অনুপ্রাণিত করতে পারে। কৃষিসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও মনে করছেন, মাশরুম চাষের একটি বড় সুবিধা হলো - এ জন্য বিস্তীর্ণ জমির প্রয়োজন হয় না। তবে সফল হতে মানসম্মত স্পন, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, সঠিক প্রশিক্ষণ এবং তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে যথাযথ জ্ঞান থাকা জরুরি। পরিকল্পিতভাবে এগোতে পারলে এটি তরুণদের আত্মকর্মসংস্থানের একটি সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে।

শ্রীমঙ্গল উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আলাউদ্দিনও মাশরুম চাষে তরুণদের আগ্রহকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তাঁর মতে, প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত জ্ঞান কাজে লাগিয়ে চাষ করলে এ খাতে সাফল্যের সুযোগ রয়েছে। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকেও উদ্যোক্তাদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহযোগিতার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হবে বলে জানিয়েছেন তিনি। সব মিলিয়ে, মাত্র ৫০ হাজার টাকার পুঁজি থেকে তিন বন্ধুর এই পথচলা শুধু একটি খামারের গল্প নয়, বরং সীমিত সামর্থ্য নিয়েও স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার অনুপ্রেরণা। এখন তাঁদের লক্ষ্য, ছোট্ট ঘরের সাফল্যকে আরও বড় উদ্যোগে পরিণত করা।