শীতের পেঁয়াজের চাহিদা মেটাতে আগেভাগেই প্রস্তুতি শুরু করেছেন রংপুরের পীরগঞ্জের কৃষকরা। মাঠজুড়ে চলছে জমি তৈরি আর মুড়িকাটা পেঁয়াজ রোপণের কর্মযজ্ঞ। বীজের দাম কিছুটা কম থাকায় তাঁদের মনে ফিরেছে স্বস্তি। তবে এই স্বস্তির সঙ্গে জড়িয়ে আছে ভালো ফলন আর বাজারে ন্যায্য দাম পাওয়ার প্রত্যাশা। কারণ, মাঠের পরিশ্রম তখনই সার্থক হবে, যখন ফসল বিক্রি করে মিলবে কাঙ্ক্ষিত লাভ।
কৃষকদের এই ব্যস্ততার মধ্যেই চলতি মৌসুমে মুড়িকাটা পেঁয়াজ চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে কৃষি বিভাগ। পীরগঞ্জ উপজেলায় এবার ২ হাজার ৫০ হেক্টর জমিতে এই পেঁয়াজ আবাদ করার পরিকল্পনা রয়েছে। লক্ষ্যমাত্রা পূরণে জমি প্রস্তুত থেকে শুরু করে চারা রোপণ—সব কাজেই সময় দিচ্ছেন কৃষকেরা। প্রতিবছর শীতকালীন পেঁয়াজের চাহিদা ও লাভের সম্ভাবনা বিবেচনায় এই আবাদে তাঁদের আগ্রহও বাড়ছে। তবে উৎপাদনের এই উদ্যোগ নির্বিঘ্ন রাখতে প্রয়োজনীয় উপকরণের জোগান নিশ্চিত হওয়াও জরুরি।
বিশেষ করে সার পাওয়া নিয়ে দুশ্চিন্তা রয়েছে কোনো কোনো কৃষকের মনে। পৌর এলাকার কৃষক আব্দুস সামাদের মতে, প্রতিবছরের মতো এবারও তিনি পেঁয়াজ চাষ করছেন। তবে পরবর্তী সময়ে প্রয়োজনীয় সার না পেলে ব্যাহত হতে পারে আবাদ, কমে যেতে পারে ফলনের সম্ভাবনাও। কৃষকের এই শঙ্কা থেকেই স্পষ্ট, শুধু জমিতে পেঁয়াজ রোপণ করলেই দায়িত্ব শেষ নয়; ফসলের পরিচর্যার প্রতিটি ধাপে প্রয়োজন সঠিক সময়ে কৃষি উপকরণ পাওয়া।
অন্যদিকে, পেঁয়াজের ভালো ফলনের পাশাপাশি বাজারদর নিয়েও ভাবছেন চাষিরা। কৃষক রানু মিয়ার আশা, উৎপাদন ভালো হলে এবং বিক্রির সময় ন্যায্য দাম মিললে লাভের মুখ দেখবেন তিনি। আরেক কৃষক সুলতান মাহমুদের প্রত্যাশা, ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানি না হলে দেশীয় পেঁয়াজের বাজারদর ভালো থাকার সুযোগ তৈরি হতে পারে। অর্থাৎ, কৃষকের কাছে আবাদ সফল হওয়ার হিসাব শুধু ফলনের অঙ্কে সীমাবদ্ধ নয়; উৎপাদন খরচ বাদ দিয়ে হাতে কতটা অর্থ থাকবে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
কৃষকদের এই প্রত্যাশা পূরণে মাঠপর্যায়ে পরামর্শ ও সহযোগিতা দেওয়ার কথা জানিয়েছে কৃষি বিভাগ। উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা সুজন মিয়া বলছেন, মুড়িকাটা পেঁয়াজ চাষে কৃষকদের প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে এবং তাঁদের পাশে থাকবে কৃষি বিভাগ। পাশাপাশি সার নিয়ে উদ্বিগ্ন না হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ সুমন আহমেদ। তাঁর ভাষ্য, উপজেলায় সারের কোনো সংকট নেই। চলতি মৌসুমের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনেও কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
তবে এই পেঁয়াজের চাষপদ্ধতি সাধারণ পেঁয়াজ আবাদ থেকে কিছুটা আলাদা। পরিপক্ব পেঁয়াজকে বিশেষ কন্দপদ্ধতিতে জমিতে রোপণ করে সেখান থেকে নতুন পেঁয়াজ উৎপাদন করা হয়। এ পদ্ধতিতে মূল পেঁয়াজ থেকেই নতুন পেঁয়াজ গজায় বলে এটি মূলকাটা পেঁয়াজ নামেও পরিচিত। গ্রামবাংলার কৃষকের কাছে অবশ্য ‘মুড়িকাটা পেঁয়াজ’ নামটিই বেশি প্রচলিত। তুলনামূলক দ্রুত উৎপাদনের এই পদ্ধতি শীতকালীন পেঁয়াজের জোগান বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
সব মিলিয়ে পীরগঞ্জের কৃষকদের এখনকার ব্যস্ততা ঘিরে রয়েছে একটাই প্রত্যাশা—ফলন ভালো হবে, বাজারে মিলবে ন্যায্য দাম, আর ঘরে উঠবে পরিশ্রমের সার্থকতা। নির্ধারিত ২ হাজার ৫০ হেক্টর জমিতে আবাদ সফল হলে শীতকালীন পেঁয়াজের সরবরাহ বাড়াতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে এই উদ্যোগ। তবে কৃষকের প্রকৃত লাভ নিশ্চিত করতে উৎপাদন খরচ, সারসহ উপকরণের প্রাপ্যতা এবং বাজারদরের দিকে নজর রাখা জরুরি। মাঠে এখন পেঁয়াজ রোপণের ব্যস্ততা, আর সেই চারা বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বেড়ে চলেছে কৃষকের স্বপ্নও।