গাছের ডালে ডালে ফল, আর সেই ফল ঘিরেই বদলে যাচ্ছে গ্রামীণ অর্থনীতির চিত্র। লক্ষ্মীপুরের হাটবাজারগুলো এখন সুপারির কেনাবেচায় সরগরম। সড়কের পাশে সারি সারি স্তূপ, ক্রেতাদের দরদাম আর বস্তাভর্তি সুপারি নিয়ে ছুটে চলা যানবাহন—সব মিলিয়ে ব্যস্ততার যেন শেষ নেই। এই একটি ফসলকে ঘিরেই জেলায় তৈরি হয়েছে কয়েক শ কোটি টাকার বাণিজ্যের বিশাল ক্ষেত্র।

লক্ষ্মীপুর শহরের উত্তর তেহমনী বাজারে গেলেই চোখে পড়ে সেই কর্মচাঞ্চল্য। সপ্তাহে দুদিন বসা এই বাজারে স্থানীয় বিক্রেতাদের কাছ থেকে সুপারি কিনতে আসেন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের পাইকাররা। পাকা সুপারির ৮০টির একটি পণ বিক্রি হচ্ছে ১৫০ থেকে ১৭০ টাকায়, আর ১ হাজার ২৮০টির এক কাউনের দাম ২ হাজার ৪০০ থেকে ২ হাজার ৭০০ টাকা। শুধু এই বাজারেই প্রতি সপ্তাহে কোটি টাকার বেশি লেনদেন হচ্ছে, যা জেলার সুপারিবাণিজ্যের ব্যাপকতা তুলে ধরে।

তবে এই বাণিজ্যের বিস্তার তেহমনী বাজারেই সীমাবদ্ধ নয়। রায়পুর, সদর, রামগঞ্জসহ জেলার বিভিন্ন এলাকার শতাধিক হাটবাজারে চলছে সুপারি কেনাবেচা। গ্রামের ছোট হাট থেকে সুপারি সংগ্রহ করে বড় বাজারে নিয়ে আসেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা, এরপর পাইকারদের হাত ধরে তা পৌঁছে যায় দেশের নানা প্রান্তে। দুই দশকের বেশি সময় ধরে এই ব্যবসায় যুক্ত মোখলেছুর রহমানের মতো ব্যবসায়ীদের হাত ধরে প্রতিবছর কোটি কোটি টাকার লেনদেন হচ্ছে, আর তাতেই শক্তিশালী হচ্ছে স্থানীয় বাণিজ্যিক নেটওয়ার্ক।

সুপারির এই বাজারে লাভের হিসাব শুধু কেনাবেচাতেই আটকে নেই, বরং সংরক্ষণের কৌশলও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। পাকা সুপারি ছাড়াও ভেজানো ও শুকনা সুপারির আলাদা বাজার রয়েছে। উৎপাদিত সুপারির প্রায় ৬০ শতাংশ পানিতে ভিজিয়ে সংরক্ষণ করা হয়, বাকিটা কাঁচা অবস্থায় কিংবা রোদে শুকিয়ে বিক্রি করা হয়। মৌসুমের শুরুতে সুপারি সংগ্রহের পর মজুত করা হয়, আর কৃষকদের বিক্রি শেষ হলে জানুয়ারি থেকে মার্চে ভেজানো সুপারির দাম বাড়তে থাকে—এভাবেই সময়ের সঙ্গে বদলায় বাজারের হিসাব।

এই পুরো কর্মযজ্ঞের আরেক গুরুত্বপূর্ণ অংশ গাছ থেকে সুপারি পাড়ার শ্রমিকেরা। তাঁদের একজন রুবেল হোসেন, যিনি প্রায় ২০ বছর ধরে এই কাজ করছেন। প্রতিটি গাছ থেকে সুপারি পেড়ে পান ১০ টাকা, আর প্রতিদিন ২৫০ থেকে ৩০০টি গাছে উঠতে পারলে তাঁর আয় দাঁড়ায় আড়াই থেকে তিন হাজার টাকায়। মৌসুমে এই উপার্জন দিয়ে সংসারের ব্যয় মেটানোর পাশাপাশি কিছু অর্থ সঞ্চয়ের সুযোগও তৈরি হয়। অর্থাৎ, গাছের ফল শুধু বাগানমালিকের নয়, শ্রমজীবী মানুষের ঘরেও নিয়ে আসে স্বস্তি।

লক্ষ্মীপুরের মাটি ও আবহাওয়া সুপারি চাষের অনুকূল হওয়ায় দীর্ঘমেয়াদি আয়ের উৎস হিসেবে এই ফসলের প্রতি কৃষকদের আগ্রহ বাড়ছে। একবার গাছ লাগালে উপযুক্ত পরিবেশে ৩০ বছরেরও বেশি সময় ফলন পাওয়া সম্ভব। গত বছর জেলায় ৭ হাজার ২৪৫ হেক্টর জমিতে সুপারিবাগান ছিল, বর্তমানে তা বেড়ে প্রায় ৭ হাজার ২৫০ হেক্টর হয়েছে। গত মৌসুমে উৎপাদন ছিল ৪২ হাজার ২৭০ মেট্রিক টন, আর এবার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ৪২ হাজার ৩৫০ মেট্রিক টন। পরিসংখ্যান বলছে, ধীরে ধীরে আরও বড় হচ্ছে সুপারিকেন্দ্রিক কৃষি অর্থনীতির পরিসর।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে পাকা, শুকনা ও ভেজানো সুপারি মিলিয়ে লক্ষ্মীপুরে প্রায় ৭১০ কোটি টাকার বেচাকেনা হতে পারে। উৎপাদনের বড় অংশ আসে রায়পুর উপজেলা থেকে, এরপর রয়েছে সদর উপজেলা। কার্তিক ও অগ্রহায়ণ মাসে সুপারি সংগ্রহকে ঘিরে গ্রামীণ অর্থনীতিতে যে গতি তৈরি হয়, তার সুফল পান কৃষক, ব্যবসায়ী, পরিবহনকর্মী থেকে শুরু করে শ্রমিকেরাও। সব মিলিয়ে সুপারি এখন লক্ষ্মীপুরের বাগানের একটি ফলমাত্র নয়, বরং হাজারো মানুষের জীবিকা আর জেলার অর্থনীতির অন্যতম বড় ভরসা।