মাঠভরা ফসল, অথচ কৃষকের মুখে নেই স্বস্তির হাসি - উৎপাদন বাড়লেও ন্যায্য দাম না পাওয়ার আক্ষেপ যেন পিছু ছাড়ছে না কৃষির। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের কৃষিকে লাভজনক পেশায় রূপান্তরের তাগিদ দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তাঁর মতে, পর্যাপ্ত আয় না হওয়ায় কৃষিশ্রমিকেরা অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন, ফলে মাঠে শ্রমিক সংকটও বাড়ছে। তাই কৃষিকে টিকিয়ে রাখতে উৎপাদনের পাশাপাশি কৃষকের আয় ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাকে গুরুত্ব দিতে হবে।

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট - বারি পরিদর্শনকালে এক মতবিনিময় সভায় এসব বিষয়ে গুরুত্বারোপ করেন রাষ্ট্রপতি। কৃষিপণ্যের উৎপাদন বাড়লেও সঠিকভাবে সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাত করতে না পারায় অনেক সময় কাঙ্ক্ষিত দাম থেকে বঞ্চিত হন কৃষকেরা। এই পরিস্থিতি বদলাতে আধুনিক সংরক্ষণ প্রযুক্তির বিস্তার এবং বেসরকারি খাতকে কৃষির সঙ্গে আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করার আহ্বান জানান তিনি। কারণ, মাঠে ফলানো ফসলের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত না হলে উৎপাদনের সাফল্যও কৃষকের জন্য কাঙ্ক্ষিত সুফল বয়ে আনতে পারে না।

কৃষিপণ্যের এই সংকটের উদাহরণ হিসেবে উঠে এসেছে উত্তরাঞ্চলের আলুচাষিদের দুর্ভোগ। বিপুল পরিমাণ আলু উৎপাদিত হলেও অনেক সময় বাজারে ন্যায্য দাম না পেয়ে কৃষকদের লোকসানের মুখে পড়তে হয়। কোথাও কোথাও অবিক্রীত আলু ফেলে দেওয়ার মতো পরিস্থিতিও তৈরি হয়, অথচ পরবর্তী সময়ে বীজ আলুর দাম বেড়ে যায়। উৎপাদন এলাকা থেকে রাজধানীতে পৌঁছানোর পরও আলুর দামে দেখা যায় বড় ব্যবধান। একই ধরনের সমস্যা রয়েছে টমেটোসহ অন্যান্য সবজি ও ফলের বাজারেও। এ অবস্থায় দীর্ঘদিন পণ্য ভালো রাখার উপযোগী হিমাগার এবং আধুনিক সংরক্ষণব্যবস্থা সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন রাষ্ট্রপতি।

তবে কৃষির সম্ভাবনার জায়গাগুলোও তুলে ধরেছেন তিনি। পেঁয়াজ উৎপাদনে গবেষকদের সাফল্যের প্রশংসা করে রাষ্ট্রপতি বলেন, একসময় এই পণ্য আমদানিতে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হতো; বর্তমানে আমদানির প্রয়োজন না থাকার বিষয়টি ইতিবাচক অগ্রগতি। এই সাফল্য ধরে রাখতে ফল ও সবজির উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি সংরক্ষণ এবং প্রক্রিয়াজাতকরণেও জোর দিতে হবে। অর্থাৎ, শুধু বেশি ফসল ফলানো নয়, উৎপাদিত পণ্য যেন নষ্ট না হয় এবং কৃষক যেন বিক্রির উপযুক্ত সময় বেছে নিতে পারেন, সেই ব্যবস্থাও গড়ে তোলা জরুরি।

এদিকে উৎপাদন বাড়াতে গিয়ে মাটির স্বাস্থ্য যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়েও সতর্ক করেছেন রাষ্ট্রপতি। তাঁর মতে, অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ব্যবহারে মাটির গুণাগুণ ও ফসলের মান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই কৃষকদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব ও টেকসই কৃষিপ্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে কৃষি গবেষকদের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, বিজ্ঞানীরা উপযুক্ত সুযোগ না পেলে মেধাবী শিক্ষার্থীদের এই পেশায় আকৃষ্ট করাও কঠিন হবে। কৃষি বিজ্ঞানীদের পেনশন-সংক্রান্ত বিধিমালা পরিবর্তনের উদ্যোগ নিতেও কৃষিমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

কৃষির উন্নয়ন প্রসঙ্গে রাষ্ট্রপতি স্মরণ করেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা। খাল খনন কর্মসূচি ও উচ্চফলনশীল ধানের বীজ সম্প্রসারণের মতো পদক্ষেপ দেশের কৃষিতে পরিবর্তন এনেছিল বলে উল্লেখ করেন তিনি। পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধে আত্মত্যাগকারী বীর মুক্তিযোদ্ধা, কৃষিবিদ ও কৃষি বিজ্ঞানীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে শহীদদের স্মরণ করেন। এ সময় কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

এর আগে বারি প্রাঙ্গণে পৌঁছালে রাষ্ট্রপতিকে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়। পরে তিনি প্রতিষ্ঠানের জিন ব্যাংক ও বিভিন্ন প্রদর্শনী স্টল ঘুরে দেখেন এবং উদ্ভিদ কৌলিসম্পদ কেন্দ্রের প্রাঙ্গণে বারি কাঁঠাল-৬ জাতের একটি চারা রোপণ করেন। তাঁর এই সফরে কৃষির উৎপাদন, সংরক্ষণ, গবেষণা ও কৃষকের ন্যায্য মূল্য—সবকটি বিষয়ই গুরুত্ব পেয়েছে। এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো এসব লক্ষ্যকে বাস্তব উদ্যোগে রূপ দেওয়া। কারণ, কৃষি সত্যিকার অর্থে লাভজনক হয়ে উঠলে কৃষকের পেশায় টিকে থাকার আগ্রহ বাড়বে, আর শক্তিশালী হবে দেশের খাদ্যনিরাপত্তা ও গ্রামীণ অর্থনীতি।