একটি গাছ, সামান্য কৌতূহল আর নতুন কিছু করার অদম্য ইচ্ছা—এই তিনের সমন্বয়েই বদলে গেল এক তরুণের জীবনের গতিপথ। চাকরির পেছনে না ছুটে কৃষিকেই জীবিকার হাতিয়ার করেছেন কুড়িগ্রামের আবু রায়হান ফারুক। একটি কমলার চারা দিয়ে শুরু, আর এখন তাঁর হাতেই গড়ে উঠেছে সাড়ে সাত একরের বিশাল কৃষি খামার। যেখানে ফলের সমারোহের পাশাপাশি বিকশিত হচ্ছে আত্মকর্মসংস্থানের নতুন সম্ভাবনা।
ফারুকের এই পথচলার শুরু ২০১৮ সালে। বগুড়ায় বেড়াতে গিয়ে একটি কমলাগাছ দেখে মনে জাগে নিজেও এমন গাছ লাগানোর ইচ্ছা। বাড়ির আঙিনায় রোপণ করা সেই চারায় পরের বছরই ধরে সুস্বাদু কমলা। পরিবারের সদস্যদের প্রশংসা তাঁকে দেয় নতুন উদ্দীপনা। এরপর এক বিঘা জমিতে শতাধিক কমলাগাছ লাগিয়ে প্রথম বাণিজ্যিক ফলনেই প্রায় ৫০ হাজার টাকার কমলা বিক্রি করেন তিনি। সেই ছোট্ট সাফল্যই তাঁকে দেখায় আরও বড় স্বপ্নের পথ।
কমলা চাষে সাফল্যের পর ফারুকের আগ্রহ ছড়িয়ে পড়ে বিদেশি ফলের জগতে। ২০২১ সালে রাশিয়া ও ইউক্রেন থেকে আনা বিভিন্ন জাতের প্রায় ২০০টি আঙুরের চারা দিয়ে শুরু করেন বাণিজ্যিক আবাদ। এক বছর পর গাছে ফল আসতেই বাড়তে থাকে তাঁর আত্মবিশ্বাস। নিজেই ডাল কলমের মাধ্যমে চারা উৎপাদন করে আঙুরবাগান সম্প্রসারণ করেন আরও দুই বিঘা জমিতে। বর্তমানে আঙুরের পাশাপাশি কমলা, মাল্টা, আম, ড্রাগন, আপেল ও লটকনসহ নানা ফলের গাছ শোভা পাচ্ছে তাঁর খামারে।
তবে ফারুকের সাফল্যের গল্প কেবল ফল উৎপাদনেই সীমাবদ্ধ নয়; বাগানের চারাও হয়ে উঠেছে আয়ের বড় উৎস। নিজের খামারের ভালো ফলনশীল গাছ থেকে ডাল সংগ্রহ করে কলম পদ্ধতিতে তৈরি করছেন উন্নত জাতের চারা। তাঁর আঙুরের চারা বিক্রি হচ্ছে জাত ও আকারভেদে ২০০ থেকে ৫০০ টাকায়। কুড়িগ্রামের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন এলাকায় যাচ্ছে এসব চারা, এমনকি পৌঁছাচ্ছে ভারতেও। গত বছর ফল ও চারা বিক্রি মিলিয়ে প্রায় ৩২ লাখ টাকার ব্যবসা করেছেন ফারুক। এর মধ্যে আঙুরের চারাই বিক্রি হয়েছে প্রায় ১২ লাখ টাকার।
আয়ের পাশাপাশি জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতেও রয়েছে ফারুকের ভিন্নধর্মী পরিকল্পনা। আলাদা জমিতে কমলা, আঙুর ও আমের বাগান গড়ে তোলার পাশাপাশি একই জমিতে চাষ করছেন একাধিক ফলের গাছ। আঙুরের মাচার নিচে ফলাচ্ছেন আদা। খামারে রয়েছে কাটিমন ও বারি-৪ জাতের প্রায় ৫০০টি আমগাছ এবং প্রায় চার হাজার সুপারি গাছ। ফল ও চারা উৎপাদনের এই সমন্বিত ব্যবস্থায় যেমন বাড়ছে আয়ের সুযোগ, তেমনি তৈরি হয়েছে স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান। নিয়মিত ছয়জন শ্রমিকের পাশাপাশি কাজের চাপ অনুযায়ী নিয়োগ দেওয়া হয় অতিরিক্ত শ্রমিক।
ফারুকের এই উদ্যোগে বদল এসেছে শ্রমিকদের জীবনেও। আগে দৈনিক মজুরিতে কাজ করা আবদুর রহিম এখন নিয়মিত মাসিক বেতন পান। ফলে অনিশ্চয়তার বদলে পরিবার চালানোর ক্ষেত্রে পেয়েছেন স্বস্তি। অন্যদিকে, ভালো জাতের চারা সংগ্রহ করতে দূরদূরান্ত থেকেও আসছেন নার্সারি ব্যবসায়ীরা। তাঁদের মতে, ফারুকের বাগানের কমলার আকার ও স্বাদ ভালো হওয়ায় এসব গাছের ডাল দিয়ে চারা তৈরি করে বাজারজাত করাও লাভজনক। অর্থাৎ একটি উদ্যোগ ঘিরে তৈরি হচ্ছে কৃষি ব্যবসার নতুন সংযোগ, বাড়ছে অন্যদের এগিয়ে যাওয়ার সুযোগও।
ফারুকের স্বপ্ন এখন নিজের খামারের সীমানা ছাড়িয়ে দেশের কৃষি অর্থনীতিতে অবদান রাখা। তাঁর বিশ্বাস, পরিকল্পিতভাবে বাণিজ্যিক কমলা চাষ বাড়ানো গেলে আমদানিনির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি ভবিষ্যতে রপ্তানির সম্ভাবনাও তৈরি হবে। কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারাও তাঁর উদ্যোগকে সম্ভাবনাময় হিসেবে দেখছেন এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করছেন। উদ্ভিদবিদ্যায় পড়াশোনা করা এই তরুণের কাছে কৃষি এখন শুধু জীবিকা নয়, সম্ভাবনার এক বিস্তৃত ক্ষেত্র। একটি কমলার চারা থেকে শুরু হওয়া যে যাত্রা আজ সাড়ে সাত একরের ফলের রাজ্যে পৌঁছেছে, তা যেন বলে—সঠিক পরিকল্পনা, পরিশ্রম আর সাহস থাকলে মাটিতেই গড়ে তোলা যায় সাফল্যের নতুন ঠিকানা।