জমিতে কতটুকু সার প্রয়োজন, এবার সেই হিসাবেই মিলবে সার! কেউ বেশি নিলেন, কেউ পেলেন না—সারের বাজারে এমন বৈষম্য আর অনিয়ম ঠেকাতে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে ঝিনাইদহ জেলা কৃষি বিভাগ। কৃষকের জমির পরিমাণ ও ফসলের ধরন বিবেচনায় নির্দিষ্ট পরিমাণ সার কেনার সুযোগ তৈরি করতে চালু হচ্ছে ‘সার কার্ড’। এতে একদিকে যেমন প্রকৃত কৃষকের সারপ্রাপ্তি নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে নিয়ন্ত্রণে আসবে সারের অপচয় ও অতিরিক্ত ব্যবহার।
এতদিন অনেক কৃষকই ফসলের জমিতে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি সার ব্যবহার করেছেন ধারণার ভিত্তিতে। আবার কেউ কেউ প্রয়োজনের অতিরিক্ত সার কিনে রাখায় সংকটে পড়েছেন অন্য কৃষকেরা। এতে একদিকে উৎপাদন খরচ বেড়েছে, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে জমির উর্বরতা। এসব সমস্যা সমাধানেই কৃষকের সারের চাহিদার একটি সুনির্দিষ্ট হিসাব তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। এরই মধ্যে ঝিনাইদহ সদর উপজেলায় শুরু হয়েছে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহের কাজ।
এই ব্যবস্থায় প্রত্যেক কৃষকের জন্য তৈরি করা হবে আলাদা সার কার্ড। যেখানে থাকবে জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, ছবি ও আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ। পাশাপাশি ধান, গম, পেঁয়াজসহ বিভিন্ন ফসলের জন্য বিঘাপ্রতি ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি সারের নির্ধারিত মাত্রাও উল্লেখ থাকবে। ফলে জমির পরিমাণ ও ফসল অনুযায়ী কৃষক বিএডিসি ও বিসিআইসির ডিলার কিংবা সাব-ডিলারের বিক্রয়কেন্দ্র থেকে সার সংগ্রহ করতে পারবেন। প্রতিবার সার কেনার সময় কার্ডে লিখে রাখা হবে সারের পরিমাণ, ফসলের নাম ও বিতরণের তারিখ। ফলে নির্ধারিত সীমার বাইরে সার কেনার সুযোগও কমে আসবে।
কৃষকদের জন্য এই উদ্যোগের গুরুত্ব কতটা, তা বোঝা যায় তাদের অভিজ্ঞতা থেকেই। সদর উপজেলার কাশিমপুর গ্রামের কৃষক মেহেদী হাসানের একাধিক ফসলের আবাদ রয়েছে। তার মতে, ফসলভেদে সারের চাহিদা ভিন্ন হলেও অনেক সময় অতিরিক্ত সার সংগ্রহের কারণে অন্য কৃষকেরা প্রয়োজনীয় সার পান না। একইভাবে রামনগর গ্রামের কৃষক খানজাহান আলী মনে করেন, বেশি সার দিলেই বেশি ফলন হয়—এমন ধারণা থেকে বেরিয়ে আসা জরুরি। জমির ধরন ও ফসল বুঝেই সার প্রয়োগ করা প্রয়োজন। সার কার্ড চালু হলে এই ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফিরবে বলে আশাবাদী তারা।
শুধু কৃষকের সারপ্রাপ্তি নিশ্চিত করাই নয়, পুরো বিতরণ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনার সুযোগও তৈরি করবে এই কার্ড। শৈলকূপার ত্রিবেনী ইউনিয়নের সার ডিলার জাফর মোল্লার মতে, কৃষকের জমির পরিমাণ ও সার ব্যবহারের তথ্য সংরক্ষিত থাকলে সারের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা সহজ হবে। পাশাপাশি অতিরিক্ত সার কেনা, অবৈধ মজুত কিংবা অননুমোদিত ফসলে সার ব্যবহারের প্রবণতাও নজরদারিতে রাখা যাবে। ইউনিয়ন ও ব্লক পর্যায়ে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের তত্ত্বাবধানে এরই মধ্যে কার্ড তৈরির কার্যক্রম এগিয়ে চলছে। পর্যায়ক্রমে জেলার সব কৃষককে এই ব্যবস্থার আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, ফসলভিত্তিক সুষম সার প্রয়োগ নিশ্চিত করা গেলে একদিকে যেমন কৃষকের উৎপাদন খরচ কমবে, অন্যদিকে রক্ষা পাবে মাটির স্বাভাবিক উর্বরতা। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ মো. কামরুজ্জামান মনে করেন, সার বিতরণে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি অতিরিক্ত সার ব্যবহারের প্রবণতা কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে এই উদ্যোগ। সব মিলিয়ে ঝিনাইদহে ‘সার কার্ড’ শুধু সার কেনার পরিচয়পত্র নয়, বরং কৃষিতে পরিকল্পিত ব্যবহার ও ন্যায্য বণ্টনের নতুন একটি পদক্ষেপ। এখন দেখার বিষয়, এই উদ্যোগ কতটা কার্যকরভাবে পৌঁছাতে পারে জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রকৃত কৃষকের কাছে।